• বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৮:৩০ অপরাহ্ন

কেউ করল না শাহজালালের সমাধান

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২২
  • ১৫৩

বাংলারজমিন২৪.কম ডেস্কঃ

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ১১ দিন পার হলেও সংকটের সমাধান হয়নি। দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হলেও দায় নিচ্ছেন না কেউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষকের সঙ্গে শনিবার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠক হলেও সংকটের কোনো সুরাহা হয়নি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর ভার্চুয়াল আলোচনায়ও দমেননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। জটিলতা বাড়ছে প্রতিদিনই। এখনো উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও অন্য শিক্ষকরা গতকাল অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের জন্য খাবার নিয়ে তাঁর বাসভবনে যেতে চাইলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে খাবার নিয়ে ফিরে আসতে হয় শিক্ষকদের। বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সে আন্দোলন ঠেকেছে এক দফায়। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে উত্তাল এখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ১১ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ছয় দিন ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ফের তারা উপাচার্য বাসভবনের সামনে এসে অনশনে বসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র জানান, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দুই দফা ভার্চুয়ালি বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। প্রতিবারই শিক্ষার্থীরা তাদের সিদ্ধান্ত পরে জানানোর কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তারা উপাচার্যের এক দফা দাবিতে অনড় থাকায় আলোচনা সফলতার মুখ দেখেনি। ২২ জানুয়ারি রাতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ২ ঘণ্টা ভার্চুয়ালি বৈঠক হয় শিক্ষার্থীদের। পরদিন শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে তাদের দাবি-দাওয়া জানানোর কথা থাকলেও তারা উপাচার্যের পদত্যাগ ইস্যু ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নন বলে সাফ জানিয়ে দেন। ফলে পরদিন আর শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়নি। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. আলমগীর কবীরের নেতৃত্বে শিক্ষকদের একটি দল জুস ও খাবার নিয়ে অনশনকারী শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে যান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা ফিরিয়ে দেন। উপাচার্যের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তারা অনশন ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন। এরপর প্রক্টর ও অন্য শিক্ষকরা অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের জন্য খাবার নিয়ে তাঁর বাসভবনে যেতে চান। এ সময় বাসভবনের ফটকের সামনে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে খাবার নিয়ে ফিরে আসতে হয় শিক্ষকদের।

অনশনরত অবস্থায় আলোচনায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা : উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে আলোচনার অপেক্ষায় আছেন। তবে তারা ভাঙবেন না অনশন। গতকাল বেলা ১টায় প্রেস ব্রিফিং করে সাংবাদিকদের এমনটাই জানালেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় তারা বলেন, আমরা শিক্ষামন্ত্রী বা তাঁর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। আমাদের বলা হয়েছিল অনশন ভেঙে আলোচনায় বসতে, কিন্তু আমরা অনশন ভাঙব না। আন্দোলনকারীরা আরও জানান, অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থা সময় সময় খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। হাসপাতালে মোট ১৯ জন ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে চারজনের শারীরিক অবস্থা একটু ভালো হয়ে যাওয়ায় হাসপাতাল থেকে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে অনশনে যোগ দিয়েছেন। হাসপাতালে যারা আছেন তারাও কিন্তু অনশন পালন করছেন। এখন অনশনে আছেন মোট ২৩ জন। আর গতকাল ক্যাম্পাসে অনশন করেছেন ১৩ জন।
এবার গণঅনশনের ডাক : উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সব শিক্ষার্থী এবার একযোগে অনশনে যাচ্ছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল দুপুরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং করে এ তথ্য জানানো হয়।

এখনো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন উপাচার্য : রবিবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর অন্ধকার হয়ে পড়ে পুরো বাসভবন। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সরবরাহও বিঘ্নিত হয়। পরে এক শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনে একটি জেনারেটরের ব্যবস্থা করে দেন। ওই জেনারেটর দিয়ে জরুরি বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জেনারেটরের যে তেল মজুদ আছে তা দিয়ে হয়তো সোমবার (গতকাল) পর্যন্ত চলতে পারবেন উপাচার্য। এরপর বিদ্যুৎ ও পানির বিড়ম্বনায় পড়তে হবে উপাচার্য পরিবারকে। শিক্ষার্থীরা বাসভবনের ফটকের সামনে মানবপ্রাচীর তৈরি করে আন্দোলন করায় বাইরে থেকে জ্বালানি তেল পাঠানোরও সুযোগ নেই।

প্রধান ফটকে সিকিউরিটি চেকিং : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এবার ‘সিকিউরিটি চেকিংয়ে’ নেমেছেন। শাবির মূল ফটকে তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশরত প্রত্যেকের নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস ও পরিচয়পত্র দেখে ভিতরে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরও পরিচয়ত্রপত্র চেক করছেন। সরেজমিন দেখা যায়, শাবির মূল ফটকের ঠিক ভিতরে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেন। কেউ ক্যাম্পাসে ঢুকতে চাইলে তার পরিচয়পত্র দেখছেন। এরপর খাতায় নাম ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করে তাকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন। শিক্ষক ও সাংবাদিকদেরও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে যাতে বহিরাগতরা প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তারা সতর্কতামূলক এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

আন্দোলনকারীদের সহিংসতা পরিহারের আহ্বান শিক্ষক সমিতির : শাবি উপাচার্য বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নকারীদের কর্মকা-কে শাবি শিক্ষক সমিতি কোনোভাবেই সমর্থন করে না উল্লেখ করে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিবৃতি দিয়েছেন। রবিবার রাতে এক বিবৃতির মাধ্যমে এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তাঁরা। শাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. তুলসী কুমার দাস ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিবুল আলম বিবৃতিতে বলেন, এ ধরনের কর্মকান্ডকে শিক্ষক সমিতি কখনই সমর্থন করে না।

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের ঘটনায় আওয়ামী লীগের নিন্দা : উপাচার্য বাসভবনের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সিলেট আওয়ামী লীগ। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়- আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধানের জন্য যখন আলোচনা চলছে, সে অবস্থায় এ রকম কার্যক্রম অন্য কিছুর ইঙ্গিত বহন করে বলে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মনে করেন। এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।

উপাচার্যের পদত্যাগ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ দাবি শাবি শিক্ষক সমিতির : রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পক্ষে সভাপতি ড. তুলসী কুমার দাস ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিবুল আলম এক বিবৃতেতে বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় অবিলম্বে সরকার কর্তৃক নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি করে দায়ীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে যা যা দরকার তা অনতিবিলম্বে করতে হবে। উপাচার্যের পদত্যাগ বিষয়টি যেহেতু সরকারের এখতিয়ারভুক্ত তাই অতিদ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান শিক্ষক নেতারা।

অসুস্থ শিক্ষার্থীর অস্ত্রোপচার, ভাঙেননি অনশন : উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে অনশনরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহীন শাহরিয়ার রাতুলের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহীনের অনশনের দ্বিতীয় দিন থেকে থেমে থেমে পেটব্যথা হচ্ছিল। রবিবার বিকালে হঠাৎ পেটব্যথা বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অ্যাপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়লে রাত পৌনে ১১টার দিকে তার অস্ত্রোপচার হয়। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম বলেন, অস্ত্রোপচারের পরও মাহীন অনশন ভাঙেননি। অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের বিবৃতি : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবৃতি দিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ। সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে- ‘অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের পদত্যাগের যে দাবি তোলা হয়েছে তা দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের চক্রান্ত মনে করছি আমরা।’ আরও বলা হয়, ‘নীতিবহির্ভূতভাবে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে এখন যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে তা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে তোলার মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলার একটি চক্রান্তের অংশ বলেই প্রতিভাত হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, ১৩ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের ছাত্রীরা। এর জেরে ১৬ জানুয়ারি বিকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে উপাচার্যকে মুক্ত করে পুলিশ। সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেন কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্য বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ফলে ১৭ জানুয়ারি থেকে বাসভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদ।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..