• বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, ০৮:০৬ অপরাহ্ন

৫০ বছরে বাংলাদেশের বড় অর্জন একুশে বইমেলা !

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১

বাংলারজমিন২৪.কম ডেস্কঃ 

১৯৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের পর অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ইতিবাচক উল্লেখযোগ্য অর্জন যেমন আছে, তেমনি নেতিবাচক ঘটনাও কম নয়। এরই মধ্যে দেশের সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য একটি মাইলফলক একুশে বইমেলা। অমর একুশে বইমেলার কথা উঠলই চোখে ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বই আর মানুষের ভিড়ের চিত্র। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারিজুড়ে বাংলা একাডেমি চত্বরে চলে একুশে গ্রন্থমেলা। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণ, শিক্ষার্থী, লেখক, কবি, এমনকি প্রবাস থেকেও অনেকে আসেন বইমেলায় ঘুরতে। শুধু শহুরে লেখক, পাঠক আর প্রকাশক নন, একুশে বইমেলা টেনে আনে সৃজনশীল সবাইকে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের জন্য এ এক বড় অর্জন।

বইমেলা শুরুর প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সাল! বাংলা একাডেমির দেয়াল ঘেঁষে অল্প কিছু বই নিয়ে বসতেন কয়েকজন প্রকাশক। মূলত ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে ৮-১০ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সে সময় মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী, বর্ণ মিছিলের তাজুল ইসলাম অল্প কিছু বই এবং উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ডাকসুর সম্পাদিত একুশের সংকলন নিয়ে খবরের কাগজ বা চট বিছিয়ে বসত। যদিও তখনো সেটা একুশে বইমেলা হয়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশে বইমেলা শুরুর একেবারে গোড়ার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে যেতে হবে আরও পেছনে। ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সে সময়ের পরিচালক ও লেখক সরদার জয়েন উদ্দিন বেশ কিছু স্থানে বইমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

গবেষক ও একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব জালাল আহমেদ (লেখক জালাল ফিরোজ) প্রথম আলোকে জানান, ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে একুশের স্মরণে প্রথম সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বাংলা একাডেমিতে। প্রধান অতিথি হিসেবে সেই মেলার উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে বাংলা একাডেমির বই ৫০ শতাংশ কমিশন দিয়ে বিক্রি শুরু হয়।

তবে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পক্ষ থেকে বইমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেন লেখক সরদার জয়েন উদ্দিন। বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি এবং সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, সরদার জয়েন উদ্দিন বইমেলা আয়োজনের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ‘দ্য ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস’ বইটি পড়ে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সে বইমেলার উদ্বোধন করেছিলেন। তবে সে মেলাটি হয়েছিল কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে। ভারতের অন্নদাশংকর রায় এবং মুল্ক রাজ আনন্দ সেখানে যোগ দিয়েছিলেন।

সে অর্থে বইমেলা আয়োজনের সূচনাপর্বে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা ও সরদার জয়েন উদ্দিনের, বললেন শামসুজ্জামান খান।

বইমেলা তখন আর এখন

একটা সময় বইমেলা শুরু হতো ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে। তবে পরবর্তীকালে রাজনৈতিক নানা পটপরিবর্তনের কারণে ধারাবাহিকভাবে আয়োজন সম্ভব ছিল না। শুরুর দিকে বইমেলা মাসব্যাপীও ছিল না। তখন মেলা চলতো ৮ থেকে ১০ দিন।
মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয় ১৯৮৩ সাল থেকে। এর ঠিক আগের বছর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনজুরে মওলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আয়োজনের উদ্যোগ নেন। তবে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দেওয়ার ঘটনায় ওই বছর আর বইমেলা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

পরের বছর ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা। সে আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তখনকার বাংলা একাডেমির পরিচালক এবং বর্তমান সভাপতি শামসুজ্জামান খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল বইমেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। তখনকার মহাপরিচালক কবি ও সমালোচক মঞ্জুরে মওলা সেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বইমেলাটা আমরা তখন করতে পারলাম না। কারণ তখন এরশাদের আমল। ছাত্রদের বিক্ষোভে গুলিতে দুজন ছাত্র মারা গেলেন। পরের বছর (১৯৮৪ সালে) আমরা বইমেলা করলাম।’

বইমেলার পরিধি বিস্তার

একটা সময় ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা অনুষ্ঠিত হতো। পরে ফেব্রুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত মেলার সময় বাড়ানো হয়। পরিসর বাড়ে মেলার আয়তনেরও। ২০১৪ সালে বইমেলার পরিসর বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়।

গোটা তিরিশেক বইয়ের সমাহার থেকে মেলা ছাড়িয়েছে দেশ-কালের সীমানা। দেশের নামকরা সব প্রকাশনা সংস্থা, বই বিক্রেতা ছাড়াও বাইরের দেশ থেকেও নানা প্রকাশনা সংস্থা তাদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহণ করে। প্রতিবছরই বাড়ছে স্টল, বই আর দর্শনার্থীর সংখ্যা।

শুধু সাংস্কৃতিক মিলনমেলা নয়, মেলার বই বিক্রি থেকে প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ আসে। দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান বলেন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ ছাত্ররা মূলত বইমেলায় আসে, বই কেনে। যারা ধনী বা অতিধনী, তারা কিন্তু বই কেনে না। ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করলে বড় প্রকাশকদের লাভ হচ্ছে, নামকরা লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে। নতুন লেখক নতুন প্রকাশকদের অনেকে বলেন, তাদের সেভাবে লাভ হচ্ছে না। আবার লাভ না হলে তো এত লোক আসত না স্টল দিতে।

বাংলা একাডেমির তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ ২০২০ সালে বইমেলায় নতুন বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার (৪ হাজার ৯১৯টি)। আর ২০২০ সালে মেলায় বইয়ের বিক্রি থেকে মোট আয় হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা।

বইমেলায় বইয়ের বিক্রির হার বাড়তে থাকে চলতি শতকের শুরুর দিক থেকে। ২০০৩ সালে বইমেলায় বিক্রি হয়েছিল ১০ কোটি টাকার বই। এর ঠিক এক দশক পরে ২০১৩ সালে বইমেলায় বিক্রি হয়েছিল অনেকটা সমমূল্যের অর্থাৎ ১০ কোটির বেশি টাকার বই (১০ কোটি ১৪ লাখ ৭৩ হাজার)। বই বিক্রির আয়ে এক দশকে যেখানে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি, সেখানে ২০২০ সালে অর্থাৎ সাত বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৮০ কোটিতে দাঁড়ায়।

এর বড় একটি কারণ হিসেবে বইমেলার পরিসর বাড়ানোর বিষয়টিকে উল্লেখ করছেন বাংলা একাডেমির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পাঠক তৈরিতে বইমেলার ভূমিকা

বাংলাদেশে লেখক-পাঠক তৈরির ক্ষেত্রে একুশে গ্রন্থমেলার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ১৯৭০ সাল থেকে বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত তিনি।
সেলিনা হোসেন বলেন, ‘এই মেলাকে ভর করে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এই মেলার অনেক দরকার ছিল। এ তো লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের প্রাণের মেলা। বহু লেখক, পাঠক তৈরি হয়েছে এই মেলাকে কেন্দ্র করে।’

কবি ফরিদ কবির বলেন, একুশে বইমেলার মাধ্যমে পাঠের সীমা বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘একটা সময় আমরা পুরোনো আমলের, মৃত লেখকদের বই পড়তাম। কিন্তু বইমেলার কারণে অনেক নতুন, অনেক তরুণ লেখকের বই পড়ছি। আমাদের পাঠের সীমা বেড়েছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..