• রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:২২ অপরাহ্ন

হজরত মূসা ও খিজির (আ.) এর ঘটনা

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২০
  • ১৬৫

অনলাইন ডেস্কঃ সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-কে বললাম, নাওফুল বিকালী বলে থাকে খিজিরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারী মূসা বানী ইসরাইলের মূসা (আ.) ছিলেন না। একথায় ইবনু আব্বাস (রা.) বললেন, মহান আল্লাহর দুশমন মিথ্যে কথা বলছে।

উবাই ইবনু কাব (রা.) আমাকে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, মূসা (আ.) বানী ইসরাইলদের মাঝে ওয়াজ করছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী কে? জবাবে তিনি বললেন, আমি সবচেয়ে জ্ঞানী। আল্লাহ তায়ালা তার ওপর রুষ্ট হলেন। কারণ, জ্ঞানের বিষটি তিনি মহান আল্লাহ দিকে সম্পৃক্ত করেননি।

আল্লাহ তায়ালা তাকে ওহির মাধ্যমে বললেন, দু’সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা অবস্থান করছে, সে তোমার চেয়ে বেশি জানে। মূসা (আ.) বললেন, হে আমার রব! আমি তার কাছে কেমন করে পৌঁছাতে পারি? আল্লাহ তায়ালা বললেন, একটা মাছ সঙ্গে নাও এবং সেটা থলির মধ্যে রাখো। যেখানে সেটাকে হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তাকে পাবে।
তারপর তিনি একটা মাছ নিলেন। সেটা থলিতে রাখলেন তারপর চলতে লাগলেন। তার সঙ্গে ইউশা‘ইবনু নুন নামক এক যুবকও ছিলেন। তারা সমুদ্র কিনারে একটি পাথরের কাছে পৌঁছে গেলেন এবং তার ওপর মাথা রেখে দু‘জনে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলির মাঝে লাফিয়ে উঠল। থলি থেকে বের হয়ে সেটা সমুদ্রের পানিতে চলে গেল।

আর যেখান দিয়ে মাছটি চলে গিয়েছিল, আল্লাহ তায়ালা সেখানে সমুদ্রের পানির চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং সেখানে একটি সুড়ঙ্গ বানিয়ে দিয়েছিলেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর তার সাথী তাকে মাছটির কথা জানাতে ভুলে গেলেন। সে দিনের বাকি সময় ও সে রাত তারা চললেন। পরের দিন মূসা (আ.) বললেন, এ ভ্রমনে বেশ ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে, এখন আমাদের আহার আনো।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আসলে আল্লাহ তায়ালা যেস্থানে সাক্ষাতের কথা বলেছিলেন সে স্থান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় থেকেই মূসা (আ.) ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। তখন তার খাদিম তাকে বললেন, আপনার মনে আছে যে শিলাখণ্ডের পাশে আমরা বিশ্রাম করেছিলাম, সেখানেই মাছটি বিস্ময়করভাবে সমুদ্রের মধ্যে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমি মাছটির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে শয়তান আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। তাই আমি আপনাকে তা জানাতে পারিনি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মাছটি সমুদ্রে চলে গিয়ে ছিল তার পথ বানিয়ে। মূসা (আ.) ও তার খাদিমকে (ইউশা‘ইবনু নুন) তা আশ্চর্যান্বিত করে দিয়েছিল।

মূসা (আ) বললেন, এটিই তো আমরা সন্ধান করছিলাম। কাজেই তারা নিজেদের পদচিহৃ অনুসরণ করতে করতে সে স্থানে ফিরে এলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তারা উভয়ে নিজেদের পদরেখা অনুসরণ করতে করতে পূর্বের শিলাখণ্ডের কাছে ফিরে আসলেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে কাপড় জড়িয়ে বসে থাকতে দেখলেন।

মূসা (আ.) তাকে সালাম দিলেন। জবাবে খিজির (আ.) তাকে বললেন, তেমাদের এ দেশে সালামের প্রচলন হলো কোথা থেকে? মূসা (আ.) বললেন, আমি মূসা? ( খিজির (আ.) জিজ্ঞেস করলেন) বানী ইসরাইলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ! আমি বানী ইসরাইলের নবী মূসা। আমি এসেছি এজন্যে যে আপনি আমাকে সে জ্ঞান শিক্ষা দেবেন যা আপনাকে শিখানো হয়েছে।

তিনি (খিজির) উত্তর দিলেন, তুমি আমার সঙ্গে সরব করতে পারবে না। হে মূসা! আল্লাহ তায়ালা আমাকে জ্ঞান দান করেছেন, এমন জ্ঞান, যার (সবটুকুর) সন্ধান তুমি পাওনি। আল্লাহ তায়ালা তোমাকেও জ্ঞান দান করেছেন, এমন জ্ঞান, যার (সবটুকুর) সন্ধান আমিও পাইনি।

মূসা (আ.) বললেন, ইনশা-আল্লাহ আপনি আমাকে সবরকারী হিসেবে পাবেন এবং আমি আপনার কোনো হুকুমের বিরুদ্ধে যাব না। খিজির (আ.) তাকে বললেন, যদি তুমি আমার সঙ্গে চলতে চাও তাহলে আমাকে কোনো প্রশ্ন করবে না যতক্ষণ না আমি নিজেই তা তোমাকে না বলি। কাজেই তারা দু‘জন রওয়ানা হয়ে গেলেন।

তারা সমুদ্র কিনার ধরে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তারা একটি নৌকা দেখতে পেলেন। তাদেরকে নৌকায় করে নিয়ে যাবার ব্যাপারে নৌকার মাঝিদের সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা খিজির (আ.)-কে চিনতে পারল। তাই তাদেরকে বসিয়ে গন্তব্য স্থলে নিয়ে গেল কিন্তু এর বিনিময়ে কোনো মূল্য নিলো না। যখন তারা উভয়ে নৌকায় চড়লেন, খিজির (আ.) কুড়াল দিয়ে নৌকার একটা তক্তা ছিদ্র করে দিলেন। মূসা (আ.) তাকে বললেন, এরা তো বিনা পয়সাতে আমাদেরকে বহণ করলেন। অথচ আপনি এদের নৌকাটির ক্ষতি করলেন। আপনি নৌকাটা ফাটিয়ে দিলেন আরোহীদের ডুবিয়ে দেবার জন্য। আপনি তো একটা অন্যায় কাজ করলেন।

খিজির (আ.) বললেন, আমিকি পুর্বেই তোমাকে বলিনি আমার সঙ্গে চলার ব্যাপারে তুমি কোনো ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না? মূসা (আ.) বললেন, আমি যেটা ভুলে গিয়েছিলাম সেটার জন্য আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত তলব করবে না। আর আমার ব্যাপারে খুব বেশি কঠোরতা করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মূসা (আ.) প্রথমবার ভুলে গিয়েই এটা করেছিলেন।

এরপর আসলো একটা চড়ুই পাখি। পাখিটা বসলো নৌকার এক পাশে। ঠোঁট দিয়ে সমুদ্র হতে এক বিন্দু পানি পান করল। এ দৃশ্য দেখে খিজির (আ.) মূসা (আ.)-কে বললেন, এ চড়ুইটা সমুদ্র হতে যতটুকু পানি খসালো, আমার ও তোমার জ্ঞান মহান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় এতটুকুই।

তারপর তারা নৌকা ত্যাগ করে হাঁটতে লাগলেন। সমুদ্রের তীর ধরে তারা হাটতে লাগলেন। পথে খিজির (আ.) দেখলেন, একটি বালক অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলা করছে। তিনি হাত দিয়ে বালকটিকে ধরলেন। দেহ থেকে তার মাথাটা পৃথক করে দিলেন। তাকে হত্যা করলেন।

মূসা (আ.) তাকে বললেন, আপনি একটা নিষ্পাপ বালককে হত্যা করলেন, অথচ সে কাউকে হত্যা করেনি? আপনি তো একটা খারাপ কাজ করে ফেলেছেন। তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে পূর্বেই বলিনি যে, আমার সঙ্গে তুমি সবর ধরে চলতে পারবে না। (বর্ননাকারী) বলেন, এ কাজটি প্রথমবারের চেয়ে মারাত্নক ছিল।

মূসা (আ.) বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোনো প্রশ্ন করি তাহলে আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না। এখন তো আমার দিক থেকে আপনি ওজর পেলেন। পরে তারা সম্মুখের দিকে চলতে লাগলেন।

চলতে চলতে তারা একটি জনবসতিতে গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানকার লোকদের কাছে খাদ্য চাইলেন। তারা তাদের আতিথেয়েতা করতে অস্বীকার করল। সেখানে তারা একটি দেয়াল দেখতে পেলেন। দেয়ালটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। (বর্ণনাকারী) বলেন, দেয়ালটি ঝুঁকে পড়েছিল। খিজির (আ.) দাঁড়ালেন। নিজের হাতে দেয়ালটি গেঁথে সোজা করে দিলেন।

মূসা (আ.) বললেন, এ বসতির লোকদের নিকট আমরা আসলাম, খাদ্য চাইলাম, তারা আমাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। আপনি চাইলে এ কাজের পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। (অথচ আপনি তা করলেন না, বিনা পারিশ্রমিকে কাজটি করে দিলেন) খিজির (আ.) বললেন, ব্যাস, এখন থেকে তোমার ও আমার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটল।

এখন আমি তোমাকে সে বিষয়গুলোর তাৎপর্য বুঝিয়ে দেবো; যেগুলোর ব্যাপারে তুমি সবর করতে পারোনি। সে নৌকাটির ব্যাপার এ ছিল যে, সেটির মালিক ছিল কয়েকটা গরীব লোক। সমুদ্রে শরীর খেটে তারা জীবন ধারণ করত। আমি নৌকাটাকে দোষী করে দিতে চাইলাম। কারণ হচ্ছে, সামনে এমন এক বাদশাহর এলাকা রয়েছে যে প্রত্যেকটা নৌকা জোড়পূর্বক কেড়ে নেয়।

তারপর সে বালকটির কথা। তার বাপ-মা ছিল মুমিন। আমরা আশংকা করলাম ছেলেটি তার নাফরমানী ও বিদ্রোহাত্নক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে কষ্ট দেবে। তাই আমরা চাইলাম, আল্লাহ তায়ালা তার পরিবর্তে তাদেরকে যেন এমন একটি সন্তান দেন, যে চরিত্রের দিক দিয়ে তার চেয়ে ভালো হবে এবং মানবিক স্নেহ ও দয়ার ক্ষেত্রেও তার চেয়ে উত্তম হবে।
আর এ দেয়ালটার ব্যাপার এই যে, এটা হচ্ছে দু‘টো ইয়াতীম বালকের; তারা এ শহরে বাস করে। এ দেয়ালের নীচে তাদের জন্য ধন-সম্পদ লুকানো রয়েছে। তাদের পিতা ছিলেন সৎ ব্যক্তি। তাই তোমার প্রতিপালক চাইলেন, ছেলে দু‘টি বড় হয়ে তাদের জন্য রাখা ধন-সম্পদ লাভ করবে। তোমার প্রতিপালকের মেহেরবানীর কারণে এটা করা হয়েছে। আমি নিজের ইচ্ছায় এসব করিনি। এ হচ্ছে সেসব বিষয়ের তাৎপর্য, যে জন্য তুমি সবর করতে পারোনি।

রাসূলুল্লা (সা.) বলেছেন, ভালো হতো যদি মূসা আরো একটু সবর করতেন। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাদের আরো কিছু কথা আমাদের অবগত করাতেন। (সহিহ বুখারী,হা: ৪৭২৫)।

হাদিসের শিক্ষা:

(১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই একমাত্র জ্ঞানের উৎস।

(২) তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে জ্ঞান দান করেন। যেমনটি তিনি খাযির (আ.)-কে তার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান
করেছিলেন। সূত্র: সাপ্তাহিক আরাফাত

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..