• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

আমার ডাক্তারসাহেব আর নেই…

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২০
  • ২৮৫

আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার সমুদ্রপাড়ে সাজানো সেই সুখের সংসার লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। আমার ডাক্তারসাহেব আর নাই। মাত্র ৩১বছর বয়সে হুট করে চলে গেছে আল্লাহপাকের কাছে।

কেউ জানেনা, সেইদিন থেকে দেশে আসার আগ পর্যন্ত কি পরিমান স্ট্রাগল আমি করেছি। বারবার বহুজনকে এই কাহিনী বলেছি, বলতে হয়েছে। প্রত্যেকবারই বুকের ভেতর রক্ত ঝরেছে এখনো ঝরছে। তাই যতটা সম্ভব সেই সময়ের সবকিছু এখানে পর্ব আকারে লিখেছি। সবার কাছে বিনীত অনুরোধ, আমার স্বামীর জন্য সবাই দোয়া করবে যেন তাঁর জান্নাত নসীব হয়।

১. আমার তনু!

৬ডিসেম্বর। শুক্রবার সকাল ১০টা। টিং টিং টিং টিং! ঘুম ভেঙে দেখি ও টিভির পাশের চেয়ারটাতে বসে মগে মাইলো গোলাচ্ছে। প্লেটে ওর ব্রেকফাস্ট। ঘুমের ঘোরে জিজ্ঞেস করলাম কয়টা বাজে? বললো দশটা বাজে। বললাম, এতো সকালে চলে আসলা! ও বললো আজকে ফ্রাইডে। নাস্তা করবা?
ফ্রাইডে! তারমানে আজকে সারাদিন সে বাসায়। নাস্তা বানাতে নিষেধ করে খুশিমনে আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

এরমধ্যে সে ব্রেকফাস্ট শেষ করে ড্রেস চেঞ্জ করেছে, চুলায় ভাত বসিয়েছে। এরপর বিছানায় এসে হেলান দিয়ে শুয়েছে। ওর গায়ের গন্ধ পেয়ে ঘুমের মধ্যেই আমি গুটিসুটি হয়ে ওর কোলের ভেতর ঢুকে গিয়েছি। ও বেশ খানিক্ষন আমাকে বুকের মধ্যে রেখে তারপর আমাকে আস্তে করে শুইয়ে দিয়ে বললো বাবুনি, ভাতটা দেখে আসি। ভাত দেখে এসে আবার আমাকে বুকের মধ্যে নিয়ে শুয়ে রইলো। এইভাবে শুয়েই ফোন টিপছিলো, সাড়ে চার বছরের অভ্যাস!

এরপর আবার আমাকে বললো ভাতটা নামিয়ে রেখে আসি। আমার ঘুম ততক্ষনে হালকা হয়ে গিয়েছে। ও ভাত নামিয়ে রেখে এসে আবার আমাকে বুকের ভেতর পুরে নিলো। আমি আরোও কিছুক্ষন গুটিসুটি হয়ে ওর বুকের ওম নিলাম। এরপর উঠে পড়লাম, আজকে ফ্রাইডে, অন্তত দুই তিনদিনের জন্য তরকারি করে ফেলবো।

হালকা শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো, ও বললো পেয়াজ রসুন ঘরে এনে কাটো। রান্নাঘরে শুধু ফ্যানের বাতাসে তোমার কষ্ট হয়! আমি বললাম তুমি যাবেনা? (ছুটির দিনে দুজন একসাথে গল্প করতে করতে রান্না করতাম)
ও বললো নো! আমি এখন একটু পড়বো।
আমি ঘর থেকে বের হতে হতে স্বভাবসুলভ মজার ছলে ওকে বললাম তরকারি ভালো হলে কিন্তু সবটা খেয়ে ফেলবো, তোমাকে দিবোনা! সে হেসে উত্তর দিলো ‘আচ্ছা খেয়ো। আমি রাতের জন্য রেস্টুরেন্ট থেকে চিকেন নিয়ে আসবো।’
ইশ! একটাবার যদি ফিরে ওর মুখটা দেখতাম! আমিতো বুঝিনি, এটাই ওর শেষ কথা! এটাই আমাদের শেষ দেখা!

কিচেনে চলে গেলাম। ততক্ষনে দুপুর বারোটার কাছাকাছি বাজে। আগের রাতে বলেছিলো পাঙাশ মাছ শুধু পেঁয়াজ দিয়ে ভূণা কোরো। সেই পাঙাশ মাছ সিংকে রাখা। চুলায় মশলা কষছে। আমি ফ্রিজথেকে একটা পানির বোতল নিয়ে ঘরে ঢুকলাম, ওকে বলবো বোতলটা ভরে রাখতে। সবমিলিয়ে খুব বেশি হলে দশমিনিট?

ঢুকে দেখি, দশমিনিট আগে যে ছেলেটা আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপ টিপছিলো, এখন সে কেমন ভেঙেচুড়ে শুয়ে আছে। শোয়ার ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক। আমি লাইট অন করতে করতে বললাম এই তোমার পড়াশোনা? দেখি! ঠিক করে শোও! এই বলে ওর ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে ভাল করে বালিশে শোয়াতে গিয়ে দেখি ওর ঘাড়টা দুইমাসের বাচ্চার মত নরম হয়ে গেছে। মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম, ওর চোখ আধবোজা, চোখের মনি কুচকুচে কালো আর চোখের সাদা অংশ জুড়ে লাল লাল শিরা।

আমার বুকের ভেতর কেমন জানি করে উঠলো। ব্যাকুল হয়ে ডেকে উঠলাম ‘তনু! জান আমার! সোনা! কি হইসে বাবু? প্লীজ ওঠো!’ বারবার ডাকি, আমার জানটা উত্তর দেয়না। আমি তখন চিৎকার করে দোয়া পড়ছি আর ওর পালস চেক করছি… নাই! পালস নাই! ওর নাকের নিচে হাত রেখে দেখি ঠান্ডা! পাশের রুমে ছুটে গিয়ে সাজিথাকে ডাকলাম, প্লীজ আসো! ডাক্তারসাহেব নিশ্বাস নিচ্ছে না!’ ও ছুটে এসে জোরে জোরে ডাকলো, পালস চেক করলো, সিপিআর দিলো। – নো রেস্পঞ্জ!
আমি তখন পুরোপুরি উন্মাদ। চিৎকার করে আয়াতুল কুরসী পড়ছি আর বলছি ‘দিস ইজ নট হ্যাপেনিং! দিস ইজ আ নাইটমেয়ার!’
ভিডিওকলে শ্বশুর আব্বুকে ট্রাই করছি, পাচ্ছিনা। আম্মুকে কল দিলাম, আম্মু রিসিভ করতেই চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম আম্মুগো! তনু নিশ্বাস নেয়না! ওর কি হইসে আম্মু?!

এরপর সবকিছু কেমন যেন..
আশেপাশের বাসাগুলো থেকে লোকজন চলে এসেছে, সাজিথা এম্বুলেন্স কল করেছে, এম্বুলেন্স চলেও এসেছে। ৫’১০” হাইট, ১১৫কেজির ছেলে! চারজন মিলেও তুলতে পারলোনা। শেষপর্যন্ত আমাদের ব্ল্যাংকেটে ওকে তুলে ছয়জন মিলে এম্বুলেন্সে তুললো। আমি তখনও চিৎকার করে যাচ্ছি ‘প্লীজ ওকে সিপিআর দাও, অক্সিজেন দাও! ও নিঃশ্বাস নিচ্ছেনা কেন! ওর মাথায় যেন ব্যাথা না লাগে! প্লীজ!’
আমাকে এম্বুলেন্সে নিবেনা, আমি জোর করে ওর পাশে বসলাম। ২মিনিট দূরে হসপিটাল, এই ২মিনিট যেন অনন্তকাল। আমি পুরো সময় ওকে ধরে ঝাকাচ্ছি আর বলছি জানটা কি হইসে ও বাবু কথা বলো! সোনা প্লীজ একটাবার তাকাও!

হসপিটালে পৌছেই ওরা ওকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে দরজা আটকে দিলো। আমি বাইরে বসে সমানে চিৎকার করছি আল্লাহ আমার হায়াত নিয়ে নাও ওকে ফেরত দাও! আল্লাহ আমার হাজবেন্ডের নিঃশ্বাস ফেরত দাও! আবার আয়াতুল কুরসী পড়ছি। আবার আম্মুকে শ্বশুর আব্বুকে কল দিয়ে কাঁদছি।
কি পরিমান অসহায় আর কষ্টের মূহুর্ত যে ছিলো! এক আল্লাহ ছাড়া কেউ বুঝবেনা!

আমাকে ওরা ইমার্জেন্সির সাম্নে বসতে দিলোনা। জোর করে লেবার ওয়ার্ডে নিয়ে গেলো। সেই লেবার ওয়ার্ড! মাঝরাতে অন কল থাকলে ও আমাকে বাসায় একা না রেখে সাথে করে হসপিটালে নিয়ে যেতো। ও ওর চেম্বারে রোগী দেখতো আর আমি লেবার রুমে তিন চারটা চেয়ার নিয়ে আরামে বসে নেট ব্রাউজ করতাম। ও রোগী দেখার ফাঁকে আমাকে এসে দেখে যেতো, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে যেতো! আজকে সেই লেবার রুমে আমি, কিন্তু আমার ডাক্তারসাহেব তার চেম্বারে নাই। আমাকে চার পাঁচজন ধরে রেখেছে, যেন দৌড়ে ইমার্জেন্সিতে চলে না যাই।

আমি বারবার সবাইকে জিজ্ঞেস করছি প্লীজ আমাকে কেউ বলো ও কি নিঃশ্বাস নিচ্ছে? ওর কি জ্ঞান ফিরেছে? ওরা বারবার বলছে ঠিক হয়ে যাবে, আমরা তো ডাক্তার না আমরা বলতে পারছিনা, তুমি চিন্তা কোরো না! আর আমি বলছি আরে! ও নিজেই ত এই আইল্যান্ডের ডাক্তার! ওকে তাহলে কে দেখবে! তোমরা সিটি থেকে ডাক্তার আনাচ্ছো না কেন? সি এম্বুলেন্স কোথায়? ওকে কেন এখনো সিটি হসপিটালে নিচ্ছোনা! একটা মানুষ আধাঘন্টা ধরে সেন্সলেস আর তোমরা কি করছো!
ওরা বলছে সি এম্বুলেন্স নিয়ে সিটি থেকে ডাক্তার আসছে একটু সবুর করো।
আমি কিভাবে সবুর করবো! আমার জানটা আমার কলিজার টুকরাটা নিঃশ্বাস নিচ্ছেনা আর আমাকে বলে সবুর করো! আমি পাগলের মত কাঁদছি আর ওদের অনুরোধ করছি আমাকে যেন ওর কাছে যেতে দেয়! ওরা বলছে আগে ডাক্তার এসে দেখুক এরপর তুমি যাবে।

প্রায় পৌনে একঘন্টা পর দুজন ডাক্তার এসে পৌছালো। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির জন্য সমুদ্র উত্তাল চাইলেও সি এম্বুলেন্স স্টার্ট করতে পারবেনা। আমি শুধু ছটফট করছি ডাক্তারদের সাথে কথা বলার জন্য, ওকে শহরের হসপিটালে নেওয়ার জন্য….

ওকে হসপিটালে আনার প্রায় একঘন্টা হয়ে গেছে। এমন সময় ডাক্তার দুজন আমার কাছে আসলেন। আমি বললাম প্লীজ আমাকে বলেন ও নিঃশ্বাস নিচ্ছে! ওনারা কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে উত্তর দিলেন ‘উই আর স্যরি। উই আর ডিক্লেয়ারিং হিম ডেড।’

২. তারপর

আমি কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো পুরো পৃথিবী থমকে গেছে। এরপর চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। সাজিথা আর অন্যান্য স্টাফরা কাঁদতে কাঁদতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি তখন আর আমার মধ্যে নাই। চিৎকার করে একটানা বলেই যাচ্ছি ‘আমার তনু আমার তনু আমার তনু!’
ভিডিওকলে আম্মু চিৎকার করে সূরা ইয়াসিন পড়ছে আর বলছে আব্বারে কি হইসে আমাদের বলো!’ আমি কি বলবো? আমার তনু নাই! কাটা মাছের মত তড়পাতে তড়পাতে ওদের বলছি প্লীজ! এবার অন্তত আমাকে ওর কাছে যেতে দাও!

আমাকে ওর কাছে নিয়ে গেলো। দেখি কি সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে আমার জানটা! চেহারায় কোন ব্যাথার ছাপ নেই কিচ্ছু নেই। যেন আর পাঁচটা সাধারন দিনের মতই পড়াশোনা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে। আমি ওর কপালে চোখে নাকে মুখে ঠোটে পাগলের মত চুমু খেলাম, কানে কালেমা দরুদ আয়াতুল কুরসী দিলাম আর বললাম ‘তনু! আমি তোমাকে ভালোবাসি! তোমার থেকে বেশি ভালো আমি আর কাওকে বাসিনাই জানরে!’

তারপর ওদের অনুরোধ করলাম যেন কারো ফোনে একটু সুরা বাকারা প্লে করে দেয়। আমাকে ওরা ওখানে আর থাকতে দিবেনা। অন্যরুমে নিয়ে যাচ্ছে, আমি ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর বুকে মাথা রাখলাম। ওর হাতে চুমু খেলাম। ওর শরীরটা তখনও গরম.. যেন এক্ষনই আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে ‘আমার জানপাখিটা’!
ওরা আমাকে আর থাকতে দিলোনা। জোর করে ওর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যরুমে নিয়ে গেল।

৩. বাস্তবতা

আমি তখন প্রায় অজ্ঞান। মনে অসহ্য যন্ত্রনা আর মাথায় হাজারটা প্রশ্ন।
কে এই উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে আমাকে আর আমার জানটাকে নিকটবর্তী শহরে নিবে?
ওর শরীরটায় পচন ধরার আগে কি মর্গে রাখতে পারবো?
মর্গ কোথায়!
কে আমাকে আর আমার জানটাকে মালেসিটিতে পৌছায় দিবে?
মালেসিটিতে গিয়ে একা একা কই থাকবো?
কত টাকা লাগবে? আমিতো কখনো টাকার হিসাব করিনাই! কোথায় খুঁজবো কি করবো?
আমি কিভাবে একা একা ওকে দেশে নিয়ে যাবো?
কে পেপারস আর ফরমালিটিস কমপ্লিট করবে? কতদিন লাগবে?
আমি কি আমার জানটাকে দেশের মাটিতে শোয়াতে পারবোনা?
মাথা কাজ করছিলোনা। সকাল থেকে কিছু খাইনি, এতো স্ট্রেস আর বুকের মধ্যে অসহ্য কষ্ট – আমার শুধু মনে হচ্ছিলো আমি এখনো কেন বেঁচে আছি! নরকযন্ত্রনা কি একেই বলে?

শহর থেকে আসা ইন্ডিয়ান ডাক্তারকে পাগলের মত কি সব জিজ্ঞেস করছিলাম! আচ্ছা! আমি মরে গেলে কি ওকে পাবো? বৃদ্ধ ডাক্তার সাধ্যমত আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এক একটা মূহুর্ত যেন অনন্তকাল! আমি শুধু তনুকে দেখতে চাইছিলাম। ওরা বললো ‘ক্লিনিং চলছে। একটু পরই দেখতে পাবে।’ প্রায় আধাঘন্টা পর ওকে দেখতে পেলাম। ওকে ততক্ষনে সাদা কাফনে মুড়ে ফেলেছে। নাকে তুলা গোজা। গায়ের রং একটু যেন কালো হয়ে গিয়েছে।

ওকে এইভাবে দেখে পুরোপুরি অনুভূতিশুন্য হয়ে গেলাম। আমার ৩১বছরের তরতাজা ডাক্তারসাহেব! যে সকালেও এই হসপিটালে রোগী দেখে গিয়েছে, এখন সেই হসপিটালেই লাশ হয়ে পড়ে আছে। মালদ্বীপের এক গহীন দ্বীপে, যেখানে ও ছাড়া আমার আর কোন আপন মানুষ নাই, সেইখানে আমাকে চিরতরে একা করে দিয়ে ও চলে গেছে। আমি এখন কি করবো? কি করে এই ব্যাথা সহ্য করবো?
আমাকে কি একটা ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। ঘুম হলোনা, কেমন আচ্ছন্নের মত পড়ে রইলাম।

এরই মধ্যে ম্যানেজার এসে বললো তোমার বাসায় যেতে হবে। কেন? কারন আমার সবকিছু প্যাক করতে হবে, পাসপোর্ট লাগবে, টাকা লাগবে। এই অসহ্য শোক সহ্য করেই বাসায় যেতে হলো। গিয়ে দেখি হসপিটালের স্টাফরা নিজেদের মত করে প্রায় সবই প্যাক করে ফেলেছে। তনু শেষবারের মত বিছানার যে জায়গায় পড়ে ছিলো, সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। ওরা জোর করে টেনে তুলে বললো এটা শোক করার সময় না, তোমার এখন অনেক দ্বায়িত্ব, ইউ হ্যাভ টু বি স্ট্রং!

আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে, আমি বিরবির করে বলছি তনু তনু! বারবার সেন্স হারিয়ে ফেলছি। এরমধ্যেই ওরা আমাকে ধরে ঝাকাচ্ছে, প্রশ্ন করছে এটা কোথায়? ওটা কোথায় রাখবো? এগুলো কি তুমি নিবে?… কি অবর্ননীয় কষ্ট! কি অবর্ননীয় পরিস্থিতি! শুধু আমার আল্লাহ আর আমি জানি, কেমন ছিলো সেসব!

৪. বিদায় মায়াবুধু!

প্যাকিং শেষ হতেই আমাকে নিয়ে সবাই রওনা হলো জেটির দিকে। বৃষ্টি থেমেছে, এখনই রওনা হতে হবে। জানতে পারলাম সাজিথা আমার সাথে যাচ্ছে। স্পিডবোটে উঠে দেখি আমার জানটাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে রেখেছে। আমি ওর পাশে বসতে চাইলাম, সাজিথা আমাকে জোর করে সিটে বসালো। আমি সিটে বসে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা শরীরটার দিকে। মাত্র ৩/৪দিন আগে দুজন মিলে শহরে গিয়েছি, কত কি কিনেছি, মজা করেছি! সামনের মাসে আমাকে নৌকা কিনে দিবে বলেছে। বাসার পেছনে খালি জায়গা পরিষ্কার করিয়েছে সেখানে বার্বিকিউ স্ট্যান্ড বসাবে বলে। জানুয়ারিতে ওর রেজিস্ট্রেশন এক্সাম আর ২৯ফেব্রুয়ারী ওর জন্মদিন। কিভাবে ছুটি মিলাবে তাই নিয়ে আমাদের কত টেনশন! মাত্র ৩/৪দিন আগের কথা! আর এখন সে সব টেনশনের উর্দ্ধে।

শহরে পৌছে হসপিটালের একটা বেডে ওকে শোয়ানো হলো আর পাশের বেডে আমাকে শোয়ালো। ওকে পর্দা দিয়ে আড়াল করে দিচ্ছিলো আমি বললাম যেন মুখটা অন্তত না ঢাকে! পাশের বেডে শুয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। সূর্যাস্ত হচ্ছে। আর আমার মনে হচ্ছে আগের দিনের কথা। বিচে পাশাপাশি বসে সূর্যাস্ত দেখতাম দুজন, ও আমার হাত ধরে থাকতো। একটা ড্রিংক শেয়ার করে খেতাম। অন্ধকার হয়ে গেলে বাসায় ফিরতাম সেটাও হাত ধরেই। হাতটা কেন জানি ছাড়তে চাইতোনা যতক্ষন পারতো ধরে থাকতো। চলে যাবে বলেই হয়ত বেশি করে আমার স্পর্শ নিয়ে গেছে।

এইসব ভেবে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছি। কিছুক্ষন পরই আবার ফোনের শব্দে উঠে পড়েছি। ঘুম ভেঙে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে ও নেই। ঠিক ৩/৪সেকেন্ড পরই নির্মম সত্যিটা একটা জোড়ালো শকের মত আমাকে আঘাত করলো। কি অসহ্য কষ্ট!
একের পর এক কল আসছে। সবার এক প্রশ্ন কিভাবে হলো কেন হলো কখন হলো! এক একটা প্রশ্ন বুকে ছুড়ির মত বিঁধছে তাও উত্তর দিতে হচ্ছে।
আমাকে সবাই বলছে কি করতে হবে না হবে কিন্তু কিছুই আমার মাথায় ঢুকছিলোনা।

আমি কাঁদছি, কেঁদেই চলেছি। এরমধ্যেই এক বাঙালি ডাক্তার আপু, তার হাজবেন্ড ও ওখানে কর্মরত সব বাঙালি মানুষজন চলে এসেছেন। ডাক্তার আপুটা অনেক জোর করে কয়েক লোকমা ভাত খাওয়ালেন। তার হাজবেন্ড নানান ইসলামিক কথা বলে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। আরেক বাঙালি ভাই খাবার দিয়ে দিলেন যাত্রাপথের জন্য।
একে একে ওই আইল্যান্ডে নানান প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব বাঙালিরা এসে আমার ডাক্তারসাহেবকে দেখে গেলো, আমাকে সাহস আর স্বান্তনা দিলো। আর কয়েকজন বাঙালি সিনিয়র ডাক্তার ফোনে কন্টিনিউয়াসলি যোগাযোগ রেখেছেন। সময়টা এমন ছিলো আমার মাথা কাজ করছিলোনা একেবারেই। কারোর নাম মনে নেই কিন্তু আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ।

৫. অনিশ্চিত যাত্রা

রাত এগারোটার দিকে জানলাম এখন ওকে মালেসিটিতে নেওয়া হবে, স্পীডবোটে। আমাকে বলা হলো রাতে সমুদ্র উত্তাল থাকে তারওপরে আবার বৃষ্টি হচ্ছে। আমি যেন স্পীডবোটে ওর সাথে না যাই, পরদিন সকালের ফ্লাইটে যাই। কারন এভাবে গেলে সিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু আমি কি করে ওকে একা পাঠাই! হাতে হাত ধরে এইদেশে এসেছি পাশে থাকবো বলে আর এখন একা পাঠায় দিবো! মনে মনে বললাম আল্লাহ মাঝসমুদ্রে ঝড় উঠলে আর সবাই বাঁচলেও আমি যেন ডুবে মরি! মনে মনে এই দোয়া করে আমার জানটার সাথে স্পীডবোটে উঠলাম। সাথে সাজিথা।

রাত তিনটার দিকে মালে পৌছালাম।
আমাকে রিসিভ করতে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসেছেন। আমার লাগেজ পাঠিয়ে দেওয়া হলো বাংলাদেশ হাইকমিশনের অফিসে, আমার জানটাকে নিয়ে গেল মর্গে। আর সেই ভাইয়া আমাকে নিয়ে গেল সেই হোটেলে যেখানে আমি আর তনু প্রথমবার এসে উঠেছিলাম। জায়গাটা চোখে পড়ামাত্র একসাথে অজস্র স্মৃতি আমার চোখে ভেসে উঠলো।
আমি পাগলের মত কাঁদতে কাঁদতে সেই ভাইয়াকে বললাম প্লীজ আমাকে এখানে রাখবেন না আমি দরকার হলে সারারাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজবো তাও এখানে থাকবোনা! উনি আমার অবস্থা বুঝলেন। কল করলেন হুলুমালেতে, ডাক্তার মোক্তারের কাছে, অনুরোধ করলেন যেন উনি আমাকে তার বাসায় রাখেন!

এরপর গাড়ি ঘুরিয়ে মালে থেকে রওনা হলেন হুলুমালের দিকে। অসহ্য কষ্ট বুকে চেপে আমি তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ে চিন্তায় অস্থির।
যার বাসায় যাচ্ছি তিনি যদি না রাখেন? তাহলে কি আবার ওই হোটেলে যেতে হবে?
ওই হোটেলে না থাকলে অন্য হোটেলে থাকলে কত টাকা লাগবে?
আমি স্পিডবোটে ওঠার সময় ওখানকার ডাক্তারেরা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছিলো পথে যদি লাগে! সেই টাকা দিয়ে কতটুকু কি হবে?
কয়দিন থাকতে হবে এখানে?
কোথায় কোথায় যেতে হবে পেপারস এর জন্য?
সাজিথা যদি পরদিন চলে যায়? আমি একা একা কিভাবে এতোকিছু করবো!

এইসব ভাবতে ভাবতে আর চোখের পানি মুছতে মুছতে পৌছে গেলাম হুলুমালে, ডাক্তার মোক্তার আর ডাক্তার Zeba আপুর বাসায়। গাড়ি থেকে নামছি, সম্পূর্ন অপরিচিত একজন মহিলা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার গায়ের মা মা গন্ধ আমার ভয় দূর করে দিলো। আমি এই প্রথম এই অচিন দেশে কাওকে আপন মনে করে প্রান খুলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।

জেবা আপু আমাকে আর সাজিথাকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন, নিজের বেডরুমটা ছেড়ে দিলেন আমার মত সম্পূর্ন অপরিচিত একটা মেয়ের জন্য। ভাত এনে মুখে তুলে খাওয়ালেন। তাঁর হাজবেন্ড শ্রদ্ধেয় মোক্তার ভাইয়া নিজের ঘর ছেড়ে গেস্টরুমে রাত কাটালেন। আপুর মা এসে আমাকে নানুভাই বলে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন, আমি ওনার মধ্যে আমার চারবছর আগে মারা যাওয়া নানুকে খুঁজে পেলাম। সেই অসহ্য বেদনাময় রাতে, এই মানুষগুলো আমার জন্য আল্লাহর ফেরেশতা হয়ে এসেছিলো। ওনারা এভাবে আমাকে ভালোবেসে বুকে তুলে না নিলে আমি কি করতাম আসলেই জানিনা! ওনারা সবাই মিলে সারাটা রাত পাহারা দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়ালেন।

৬. কবর আজাব

পরদিন ঠিক সকাল আটটায় আমার ঘুম ভাঙলো। আমি যথারীতি কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলে গেলাম তনু নাই! মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এরপরই নির্মম সত্যটা আমাকে শকওয়েভের মত একটা ধাক্কা দিলো। আমার জীবনে তনুবিহীন প্রথম সকাল! এই শুন্যতার ব্যাথা! হাহাকার! সে যে কি কষ্ট! কি করে বোঝাবো আমি এই পৃথিবীকে!

শুরু হলো নতুন আজাব। সকাল আটটা বেজে তো থেমে থাকেনা! এক একটা মিনিট যায় আর আমি সব স্পষ্ট দেখতে পাই।
এইযে আটটা দশ বাজলো! – এখন ও ওয়াশরুমে!
এইযে আটটা বিশ – এখন ও কিচেনে। নাস্তা বানাচ্ছে!
আটটা ত্রিশ – ও টিভির পাশে বসে নাস্তা করছে!
আটটা পয়তাল্লিশ – ওর গোসল ড্রেস চেঞ্জ করা শেষ! এখন চুল আঁচড়াচ্ছে।
আটটা পঞ্চাশ – ও লোশন মাখছে, পারফিউম নিচ্ছে।
আটটা পঞ্চান্ন – ও আমার কপালে দোয়া পড়ে ফু দিলো। চুমু খেলো। আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো বাবু আমি যাই। এখন ও বাসা থেকে বের হবে।
আমি সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সব।
সাড়ে নয়টা বাজে। ও কল দিচ্ছে আমাকে। ফেরার পথে কিছু আনা লাগবে বাবু?
দশটা বাজলো – ও চাবি দিয়ে ঘরের দরজা খুললো। আমি তখনো ঘুমে। ও এসেই আমার কপালে একটা চুমু দিলো। আমি তাকিয়ে হেসে ফেললাম। ও হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রাখলো। মানিব্যাগ আর সানগ্লাসটাও রাখলো। আমি ততক্ষনে উঠে বসেছি, ও অফিসের ড্রেস না ছেড়েই বিছানায় হেলান দিয়ে বসলো, আমি ঘুম ঘুম চোখে ওর কোলের মধ্যে ঢুকে গেলাম। এইতো ও আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। এইতো ওর গায়ের গন্ধ! এইযে ওর গায়ের ওম! ওর গলার আওয়াজ! এইযে ওর আদর! সব দেখতে পাচ্ছি।

তারপর…
হুট করে দেখি কিচ্ছু নাই!
কিচ্ছু নাই!
আমার তনু নাই। তনুর আদর নাই। তনুর গলার আওয়াজ, গায়ের ওম নাই।
কিচ্ছু নাই!
আমি বসে আছি এক অচেনা বাসায়।
আমার বাসাটা গেল কই? আমার ভালোবাসা আর স্বপ্ন দিয়ে সাজানো ছোট্ট সংসারটা কই? আমার আমি কই?
নাই! সব হারিয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেছে!

ঘোর কাটলেই এক একটা নির্মম সত্য আমাকে চিরে দিতে থাকে। আমাকে বলতে থাকে,
আমার তনু ঘুমিয়ে গেছে চিরতরে। আর উঠবেনা। আর কখনো আমি ঘুম ভেঙে দেখবোনা তনু আগে থেকেই হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আর কোনদিন তনু ওর দুইহাতে আমার মুখটা ধরে বলবেনা ‘আমার চাঁদমুখ!’
আর কোনদিন হাতধরে আমরা সূর্যাস্ত দেখবোনা, মাঝরাতে বাইরে বেরিয়ে জোৎস্না দেখবোনা, আর কোনদিন একসাথে রেইনকোট পড়ে বৃষ্টিতে ভিজবোনা। আর কোনদিন কেউ অসহ্য ভালোবাসা নিয়ে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবেনা ‘তুই আমার কি রে! তুই আমার কি?!’

সব শেষ! আমার ৩১বছরের হাসিখুশি বিশালদেহী সরলহৃদয় ডাক্তারসাহেব, আমার সবটুকু সুখ স্বপ্ন হাসি আর আনন্দ নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। আমি একা হয়ে গেছি। চিরতরে। এই ৭০০বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে আমি একা!

এই উপলব্ধি আসামাত্র আমি পাগল হয়ে যাই। হাত পা ছুড়ি, কাঁদি, চিল্লাই, কিন্তু ব্যাথা তো কমেনা! জেবা আপু, তাঁর মা, আরো গাদাখানিক বাঙালি ফিমেল ডাক্তার, সাজিথা আমাকে আগলে রাখে কিন্তু আমার ব্যাথা কমেনা। আমার মন প্রান শরীর আমার সমগ্র অস্তিত্ব শুধু তনু তনু করে! এই ব্যাথা, এই অনুভূতি বোঝানোর ভাষা তো আমি জানিনা। আমি শুধু কাটা মুরগীর মত তড়পাই আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করতে থাকি। ঘড়ি, এই ঘড়ি উল্টা দিকে ঘুরে যা! আমাকে পিছিয়ে দে, তনুর কাছে নিয়ে যা!
ঘড়ি কথা শোনেনা।
সকাল আটটা থেকে দুপুর তিনটা। শেষদিন তনুর করা প্রতিটা কাজ, ওর কথা, ওর চলে যাওয়া, তারপরের সব ঘটনা এই সময়ে আমার চোখে ভাসতে থাকে। কি যে অসহ্য কষ্ট! কমপ্লিটলি কবর আজাব।

৭. আপনজন

তখনো আমাকে আনতে কেউ মালদ্বীপ যায়নি। মন্ত্রনালয় থেকে বলা হয়েছে তনুকে বিশেষ ব্যবস্থায় দেশে পাঠানো হবে আর তার আগেই আমাকে পাঠিয়ে দিবে। একা। আমি একা, সদ্য স্বামীহারা একটা মেয়ে কিভাবে একা ট্রাভেল করবো? সবাই নিজেদের মত লজিক দিয়ে ভেবেছে। শুধু আমার আম্মু আব্বু পাগল হয়ে যাচ্ছিলো আমার চিন্তায়। অবশেষে তিনদিনের দিন Rubel ভাইয়া মালে এসে পৌছালো। এসেই আমাকে ধরে বললো কাঁদেনা ভাইয়া, তুমি একা না। এইতো ভাইয়া এসে গেছে।
ভাইয়া, সেদিন বলতে পারিনাই, বলার অবস্থায় ছিলাম না, আজকে বলছি তুমি ভাইয়া আমার একটাই। রক্ত না থাক আত্মার সম্পর্কে তুমি আমার ভাই।

জেবা আপু আর মোক্তার ভাইয়ার সুবাদে ভাইয়ার থাকার ব্যবস্থা হলো। এই দুইটা মানুষ কি আসলেই মানুষ না ফেরেশতা আমার জানা নাই! ওনাদের সাহায্যেই তনুকে এই সাতদিনে মোট দুইবার দেখতে পেয়েছি। পৃথিবীতে আমার আব্বু আম্মুকে দেখেছি এমন নিঃসার্থভাবে মানুষকে সাহায্য করতে। আর এই দুইজনকে দেখলাম।
আর শায়েস্তা আপু। নিজের অমানুষিক কষ্টের কথাগুলো কি সহজ করেই না সে বলে! এই আপুটা যখন কথা বলতো, মূহুর্তের জন্য হলেও শান্তি পেতাম। হাফ ইন্ডিয়ান হাফ মালদিভিয়ান এই মেয়েটাকে আমি কোনদিন ভুলবোনা। ভুলবোনা নাম ভুলে যাওয়া বাকি ডাক্তার আপুগুলোকেও। যারা নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের সময় আর আন্তরিকতা দিয়ে আমার পাশে ছিলো।

আর Rubel ভাইয়া! হাজারটা পেপারওয়ার্ক, আমাকে মর্গে নিয়ে তনুর সাথে দেখা করানো আর এরমধ্যেই মানুষের লক্ষকোটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া- কি কি যে করেছে! আমার আসলে সব মনেও নাই!

৮. আহারে জীবন! আহারে ভালোবাসা!

তনু চলে গিয়েছে শুক্রবারে, জুমার আজানের কিছুক্ষন আগে। অর্থাৎ বারোটার আশেপাশে। ১১.৫৮মিনিটে সে মেসেজ করেছিলো তার এক স্টাফকে, ‘আমার ওয়াইফের জন্য অমুক ওষুধ লাগবে।’
কি ভাগ্য আমার! এমন স্বামী পেয়েছিলাম! যে মৃত্যুর আগেও আমার কথাই ভেবেছে।
কি ভাগ্য আমার! এমন স্বামীকে হারালাম তার ৩১বছর বয়সে।

১১.৫৮মিনিটে ও জীবিত ছিলো! এরপর কি এমন হলো যে এমন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে গেল? ডাক্তার বললেন কার্ডিয়াক এরেস্ট। দশ সেকেন্ডেই চলে গেছে। ও নিজেও নাকি বোঝেনি!
আচ্ছা? এমনকি হতে পারে? আমি যখন তনু কথা বলো বলে কাঁদছিলাম ও তখন অবাক হয়ে ভাবছিলো আমার কি হয়েছে? আমার বাবুটা কাঁদে কেন!

লিপ ইয়ারে ওর জন্ম, সাম্নের ২৯ফেব্রুয়ারী জন্মদিন ছিলো। ঢাকা খুব মিস করতো। বলেছিলো জন্মদিনে মালে যাবে, চিকেন ফ্রাই আর পিজা খাবে, বাসে চড়বে শপিং করবে! মোটকথা দুইদিনের জন্য সে জাস্ট সিটিলাইফ এঞ্জয় করবে। কথা দিয়েছিলাম এই সবই করবো তারজন্য। তার আগেই ঘুমিয়ে গেলো।

৯. ফেরা

এক শুক্রবারে তনু ঘুমিয়ে গেল। তার পরের শুক্রবারে দেশের মাটিতে পৌছালাম। যাওয়ার সময় গিয়েছিলাম পাশাপাশি বসে, হাতে হাত রেখে, চোখভর্তি স্বপ্ন আর মনভর্তি ভালোবাসা নিয়ে।
আর ফিরে এলাম আমার নিষ্প্রান স্বামীকে নিয়ে, সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে।

আগামী দুইবছরের জন্য কত প্ল্যান যে সাজিয়েছিলাম দুইজনে! ও আমাকে স্বপ্ন আদর আর ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রেখেছিলো। আমি এতোদিন বাস করেছি একটা ফেইরি প্রিন্সেসের মত। বাস্তবতার কঠোরতা কখনোই বুঝতে দেয়নি। আর ও চলে যেতেই স্বপ্নের আর ভালোবাসার সমস্ত আবরন খুলে
তিনমাসের সংসারে একেকটা দিন পাখির পালকের মত উড়ে গিয়েছে।
অথচ আজকে ও নাই মাত্র ২৩/২৪ দিন! একেকটা দিন একেকটা মূহুর্ত কি ভীষণ ভারী!

এতো অসহ্য ব্যাথা নিয়ে এতো ভারী জীবন আমি কাটাবো কি করে? জানিনা। কিচ্ছু জানিনা। শুধু জানি আমি ছিলাম তনুর আদরমাখা ভালোবাসা, আমিই ওর শেষ স্মৃতি।
সবাই দোয়া কোরো, যেদিন আমার ডাক আসবে, যেন হাসিমুখে চলে যেতে পারি। যেন কেয়ামতের আগ পর্যন্ত ইল্লিনে ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে পারি। যেন রোজহাশরের দিনে ওর সাথেই ডান হাতে আমলনামা নিয়ে দাঁড়াতে পারি। যেন একসাথে সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুলসেরাত পার হয়ে একসাথেই বেহেশতে ঢুকতে পারি। যেন আমাদের এইজীবনের অসম্পূর্ন সংসার বেহেশতে পুর্নতা লাভ করে। আমীন। আমীন। আমীন।

(এই গল্পের পুরোটাই সত্যি ঘটনা।আমি এই  গল্পের প্রতিটা শব্দ পড়েছি আর কেদেছি কোন এক কারনে। আপু আমাকে ক্ষমা করে দিও তোমার অনুমতি না নিয়েই তোমার ৩১ বছরের ডাক্তার সাহেবের শেষ সময়ের গল্পটা প্রকাশের জন্য)

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..