• শনিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২০, ১০:৩০ পূর্বাহ্ন

আধ্যাত্মিক জীবন সম্বন্ধে জানতে দীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কি?

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২০
  • ৩৪ বার পঠিত

উজ্জ্বল রায়ঃ গুরু ও গুরু-তত্ব কি দীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কি এবং গুরু কত প্রকার ও কি কি ? কি করে বুজবেন কে আপনার গুরু হতে পারেন গুরু-নির্ণয় করার পদক্ষেপ গুরু কি, সেই ব্যাপারে কোন বৃহৎ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বৈদিক জ্ঞান তোমাকে সেই ইঙ্গিত দেবে তদ- বিজ্ঞানার্থম। যদি তুমি আধ্যাত্মিক। উজ্জ্বল রায় জানান, জীবনের সম্বন্ধে জানতে চাও, তদ-বিজ্ঞানার্থম স গুরু এব অভিগচ্ছেৎ (১.২.১২) তাহলে তোমাকে অবশ্যই গুরুর নিকট যেতে হবে। আর গুরু কে? গুরু হচ্ছেন ভগবানের একনিষ্ঠ সেবক। খুব সহজ।(শ্রীমদ্ভাগবতম ৬.১.২৬-২৭, ফিলাডেলফিয়া, জুলাই ১২,১৯৭৫) গুরু-তত্ব ? আধ্যাত্মিক

গুরুদেব এবং কৃষ্ণ অভিন্ন :-
গুরু কৃষ্ণ-রুপ হন শাস্ত্রের প্রমাণে ,গুরু-রুপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগনে:-
সমস্ত শাস্ত্রের প্রমান ও সিদ্ধান্ত অনুসারে শ্রীগুরুদেবকে শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন। গুরু-রুপে শ্রীকৃষ্ণ তার ভক্তদের কৃপাপূর্বক উদ্ধার করেন।

• আচার্যকে ঠিক ভগবানের মতই সম্মান কার উচিৎ
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর আরও বলেছেন যে, “সাক্ষাদ্ধরিত্বেন সমস্তশাস্তৈর উক্তস্ততা ভাব্যত এবং সদ্ভিঃ”। আচার্য বা গুরু ঠিক কৃষ্ণের মতই। সাক্ষাদ্ধরিত্বেন। আচার্যকে কৃষ্ণের মতই সম্মান দেওয়া উচিৎ। আচার্যং মাং বিজানীয়ান্নাবমন্যেত কর্হিচিৎ (শ্রীমদ্ভাগবতম ১১.১৭.২৭)। কেউ হয়তো বোকার মত ভাবতে পারে ” তারা সাধারন এক মানুষকে আরাধনা করছে। সে তো আমার মতই আর সে আসনে বসে তার শিস্যদের কাছ থেকে সম্মান আর পূজা গ্রহন করছে” মাঝে মাঝে তারা এরকমভাবে প্রশ্ন তুলবে কিন্তু তারা জানে না আাচার্যকে কিভাবে সম্মান দেওয়া উচিত। আচার্যকে ঠিক ভগবানের মতই সম্মান দেওয়া উচিৎ সাক্ষাদ্ধরিত্বেন। এটা বারিয়ে বলা হচ্ছে না। এটা শাস্ত্র সিদ্ধান্ত অনুসারে বলা হচ্ছে। আর আচার্য এই সব সম্মান পরমেশ্বর ভগবানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য গ্রহন করেন। এটাই সঠিক পন্থা। (শ্রীমদ্ভাগবতম ১.৭.৪৫-৪৬—বৃন্দাবন,অক্টোবর ৫, ১৯৭৬)

• গুরুদেব হচ্ছেন চৈতগুরুর বাহ্যিক প্রকাশ…..
পরম গুরুদেব হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। তাই তাঁকে বলা হয় চৈত্যগুরু। যার অর্থ হচ্ছে পরমাত্মা, যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান। ভগবদ্গীতায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি অন্তর থেকে সাহায্য, এবং গুরুদদেবকে পাঠিয়ে দেন, যিনি বাহির থেকে সহায়তা করেন। গুরুদেব হচ্ছেন সকলের হৃদয়ে আবস্থিত চৈতগুরুর বাহ্যিক প্রকাশ। (তাৎপর্য, শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.৮.৪৪)

দীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কি :-

• “দীক্ষার অর্থ হচ্ছে দিব্য বা চিন্ময় কর্মকান্ডের আরম্ভ”
দীক্ষা, ঐ শব্দটার অর্থই হচ্ছে “এটাই আরম্ভ”। দীক্ষা, দীক্ষা।দী….দিব্য। আসলে দুটি শব্দ, দিব্য-জ্ঞান। দিব্য-জ্ঞান মানে হচ্ছে চিন্ময়, আধ্যাত্মিক জ্ঞান। তো দিব্য হচ্ছে ‘দী’ এবং জ্ঞানম। ক্ষয়পতি বা ব্যাখ্যা হচ্ছে ‘ক্ষ’। দীক্ষা। দুটো মিলে দীক্ষা। তাহলে দীক্ষার অর্থ হচ্ছে চিন্ময় কর্মকান্ডের আরম্ভ। সেটাই হচ্ছে দীক্ষা। তাই আমরা শিষ্যদের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি নিই যে, ” তোমরা এতগুলো বার নাম জপ করবে” “যথাজ্ঞা”। তোমাকে এই বিধিনিষেধ পালন করতে হবে ” ” যথাজ্ঞা”। এটাই দীক্ষা। শিষ্যকে অবশ্যই বিধিনিষেধ পালন করতে হবে এবং জপ করতে হবে। তাহলে সব কিছুই আপনিই শুরু করবে। ( প্রবচন, শ্রীমদ্ভাগবতম ৬.১.১৫ অকল্যান্ড, ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৭৩)

• দীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত যে কারও ভক্তমূলক সেবা নিরর্থক।
অদীক্ষিতস্য বামোরু কৃতং সর্বং নিরর্থকম
পশু-যোনিম অবাপ্লোতি দীক্ষা-বিরহিত জনঃ
“সদ-গুরুর কাছ থেকে দীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত সবধরনের পারমার্থিক কর্মকান্ড নিরর্থক থেকে যায়। যথাযথভাবে দীক্ষিত না হলে যে কোনও ব্যক্তি পশুযোনীতেও পতিত হতে পারে।
(হরি -ভক্তিবিলাস ২.৬, বিষ্ণুযামল থেকে উদ্ধৃত। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, মধ্য ১৫.১০৮. এর তাৎপর্যে ব্যবহৃত)

• দীক্ষা একজনের পাপকর্মের ফলসমূহ বিনষ্ট করে
দীক্ষা-কালে ভক্ত করে আত্মসমর্পন, সেই কালে কৃষ্ণ তারে করে আত্ম-সম।:-
দীক্ষার সময় ভক্ত যখন সর্বোত ভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় উৎসর্গ করেন, শ্রীকৃষ্ণ তখন তাকে নিজের বলে গ্রহন করেন।

• সেই দেহ করে তার চিদানন্দময়, অপ্রাকৃত-দেহে তাঁর চরন ভজয়।
তখন তিনি তার সেই দেহ চিদানন্দময় করে তোলেন এবং সেই অপ্রাকৃত দেহে ভক্ত ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবা করেন। (শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত অন্ত ৪.১৯২)

 গুরু কত প্রকার ও কি কি?
• “তারা বহুসংখ্যক নন; তারা এক, গুরু তত্ত্ব…”
গুরুদেবকেই সর্বপ্রথমে সম্মানজনক প্রার্থনা প্রদান করা হয়, বন্দে গুরুন। আর গুরুন এখানে বহু বচন হিসাবে ব্যাবহার করা হয়েছে, তার মানে হচ্ছে বহুসংখ্যক গুরু। কিন্তু তাঁরা বহুসংখ্যক নন; তাঁরা এক, গুরু-তত্ত্ব….।
(প্রবচন, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, আদি লীলা ১.১ মায়াপুর, মার্চ ২৫, ১৯৭৫ )

• গুরু হচ্ছে দুই প্রকার, শিক্ষা ও দীক্ষাগুরু:- শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে যিনি দিক্ষা প্রদান করেন সেই গুরুদেবকে দিক্ষাগুরু বলা হয়েছে, আর যেই গুরুদেব আধ্যাত্মিক প্রগতির লক্ষ্যে উপদেশ দেন তাঁকে শিক্ষা-গুরু বলা হয়েছে।(শ্রীচৈতন্য….. ৮.১২৮)

• শিক্ষা-গুরু কখনই দীক্ষা-গুরুর ব্যতিরেকে কিছু বলবেন না :- মাঝে মাঝে একজন দিক্ষাগুরু সবসময় উপস্থিত থকেন না। তাই কেউ একজন উন্নত ভক্তের কাছ থেকে শিক্ষা বা উপদেশ নিতে পারে। তাকে তখন শিক্ষা-গুরু বলা হয়। শিক্ষা-গুরু মানে এই নয় যে সে দিক্ষাগুরুর শিক্ষার ব্যতিরেকে কিছু বলবেন। তখন সে শিক্ষাগুরু থাকে না, একটা লম্পট হয়ে যায়।(ভগবদ্গীতা ১৭.১-৩—হনলুলু, জুলাই ৪, ১৯৭৪)

 কি করে বুজবেন কে আপনার গুরু হতে পারেন? গুরু-নির্ণয় করার পদক্ষেপ কি :-
একবছর প্রস্ততিমূলক সময়কাল
> ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হওয়া
> চারটি বিধিনিষেধ কঠোর ভাবে পালন করা, যথা :- i)আমিষাহার বর্জন (মাছ, মাংস, ডিম,রসুন, পিঁয়াজ, মসুর ডাল এগুলো বর্জন বর্জন করা)
ii) নেশা বর্যন ( বিড়ি, পান, তামাক, চা, কফি, নর্শী বর্জন করা )
iii) অবৈধ যৌন সঙ্গ বর্জন
iv)দ্যুত ক্রীড়া বর্জন (তাস, পাশা, লটারী,জুয়া এগুলোকে বর্জন করা)
> প্রাতঃকালিন অনুষ্ঠানে প্রতিদিন অংশগ্রহণ করা (মন্দিরবাসিরা)
> বাড়িতে বা নামহট্টে প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা ( মন্দিরের বাইরের অধিবাসীরা)

* প্রভূপাদাশ্রয় গ্রহন করা:-
> প্রধানতম শিক্ষা-গুরু হিসেবে শ্রীল প্রভূপাদের উপর মনোযোগ দেওয়া।
> প্রণাম করার সময় শ্রীল প্রভূপাদের প্রণাম মন্ত্র স্থব করা।
> জ্যোষ্ঠ ইসকন ভক্তদের দ্বারা পথপ্রদর্শন (শিক্ষ গুরু)

* দীক্ষা ও শিক্ষা-গুরু পদাশ্রয়
>প্রভুপাদের অন্ততঃ ছয় মাস পর, কেউ তার শিক্ষাগুরুর মধ্য থেকে একজন ইসকন অনুমোদিত দীক্ষাগুরু নির্ণয় করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে ছয় মাস সময়সীমাটি নূন্যতম সময়, কিন্তু এই নির্ণয় করতে যতটা সময় দরকার ততটাই নেওয়া যাবে।
> নিজেদের বিদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে সুবিবেচকের মত দীক্ষাগুরু নির্ণয় করা শিষ্যদের দায়িত্ব।
> সুতারং পদ্ধতিটা হচ্ছে গুরু গ্রহন করার আগে কমপক্ষে একবছর ধরে তাঁর কাছ থেকে শ্রবন করা উচিৎ। আর তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে “হ্যা, ইনি এমনই একজন গুরু যিনি আমাকে শিক্ষা দিতে পারেন।” তখন মন থেকেই গুরু হিসেবে গ্রহন করা যায়। ঝোকের বশে গ্রহন করবে না।
(শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১৬.২৫ —হাওয়াই, জানুয়ারী ২১, ১৯৭৪)

( এই সম্পর্কে একজন ভক্ত প্রশ্ন করেছিলেন শ্রীমৎ সুবগ স্বামী গুরুমহারাজকে মায়াপুরে যে কি করে একজন কনিষ্ঠ ভক্ত তার গুরু নির্বাচন করতে পারে তখন উনি বলেছিলেন যার কথা শুনে মনের জড়জাগতিক আসক্ত মুক্ত হচ্ছে এবং এই চারটি বিধিনিসেদ পালন করতে মনে উৎসাহিত বোদ করছেন মনে করবে সেই তার গুরু হবার যোগ্য)

> কোন আন্তরিক ভক্তের উচিৎ শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে সদগুরু নির্ণয় করা। শ্রীল জীব গোস্বামী বংশানুক্রমিকভাবে বা সামাজিক প্রথার বশবর্তী হয়ে কুলগুরু গ্রহন না করতে উপদেশ দিচ্ছেন। পারমার্থিক জীবনে যথার্থভাবে অগ্রসর হওয়ার জন্য সদগুরুর অনুসন্ধান করা অবশ্য কর্তব্য।

সদ্ গুরুর যোগ্যতা কি:-
• শ্রীগুরুদেব পরম্পরা ধারায় থাকবেন, কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা হবেন, শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে আচার ও প্রচার করেন ও হরিনাম পরায়ণ হবেন।
• যারে দেখ, তারে কহ ‘কৃষ্ণ -উপদেশ, আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার এই দেশ। ( শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত মধ্যলীলা ৭.১২৮)
• আচার প্রচার-নামের করহ কার্য, তুমি সর্ব-গুরু, তুমি জগতের আর্য:- কিন্তু তুমি ভগবানের দিব্য নামের ‘আচার ‘ এবং প্রচার কর দুটি কার্যই কর। তাই তুমি সকলের গুরু এই জগতের শ্রেষ্ঠ ভক্ত। শ্রীল সনাতন গোস্বামী এখানে স্পস্টভাবে জগদগুরুর সংঙ্গা বিশ্লেষন করেছেন। তাঁর যোগ্যতা হচ্ছে যে তিনি অবশ্যই শাস্ত্র নির্দেশানুসারে আচরণ করবেন এবং সেই সঙ্গে প্রচার করবেন। যিনি তা করেন না তিনি সদগুরু নন।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..