• রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ০৫:০১ অপরাহ্ন

৪৬ বছর পর বুকের মধ্যে গুলি খুঁজে পেলেন বাদশা

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৯৮

বাংলারজমিন/ডেস্ক রিপোর্ট: সারা বছরই হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বাদশা। শীত এলে আরও বাড়ে তার এ কষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের সময় গুলি লেগেছিল বলে সেখানে একবার অপারেশনও করতে হয়েছিল। ২০১৬ সালে তার বুকের ব্যথা এতই বেড়ে যায় যে, গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। চিকিৎসকরা তাকে চেস্ট এক্সরে করার পরামর্শ দেন। এক্সরে রিপোর্টের ভিত্তিতে ডাক্তাররা যা বললেন, তাতে বাদশা হতবাক হয়ে গেলেন- গত ৪৬ বছর ধরে তিনি তার বুকে একটি গুলি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

অসুস্থ সিরাজুল ইসলাম বাদশা আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘তিন বছর আগে গাইবান্ধায় এক্সরে করতে গিয়ে গুলির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। পরে বগুড়া হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করাই। ওরা বলেছে- ‘গুলিটি মাংস ও হাড়ের সঙ্গে শক্ত হয়ে মিলে আছে। কোনো সমস্যা নাই। পচনও ধরে নাই।’ তার পরও ১১-১২ দিন হাসপাতালে ছিলাম। কোনো সমস্যা নেই জানার পর হাসপাতাল ছেড়েছি। হাঁপানি-ডায়াবেটিসের ওষুধ খেতে হয়। শীত এসেছে; বুকের ব্যথা তাই আবারও বাড়ছে।’

সিরাজুল ইসলাম বাদশার বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে। তার জন্ম ১৯৪৭ সালের ১ জুলাই ওই গ্রামেই। একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল পদে খুলনায় কাজ করতেন। বাবা দেলোয়ার হোসেন চাকরিজীবী (প্রয়াত) ও মা জাহেদা বেগম গৃহিণী (প্রয়াত) ছিলেন। ১০ ভাই, এক বোনের মধ্যে বাদশা তৃতীয়। অষ্টম শ্রেণির পড়াশোনা শেষে ১৯৬৮ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন তিনি। একাত্তরের এপ্রিলে খুলনার খালিশপুর পুলিশ লাইন থেকে চলে এসে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পটভূমি তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই খুলনা উত্তাল হয়ে যায়। তবুও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলাম। ২৫ মার্চ পাকিস্তান বাহিনী গণহত্যা শুরুর পর ওই রাতেই বিদ্রোহ করি আমরা। পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র লুট করে অন্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নদীর ওপাড়ে স্টার জুট সংলগ্ন সানেরহাট এলাকায় এসে আশ্রয় নিই। সঙ্গে ছিল বগুড়ার সারিয়াকান্দির কনস্টেবল হাবিব ও তার স্ত্রী। সেখান থেকে কয়েক দিন পর রওনা হই রংপুরের দিকে। হেঁটে চলে আসি বাড়িতে। স্থানীয়রা আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দেয়, নয়তো ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এপ্রিলে সেখান থেকে লুকিয়ে নদীপথে চলে যাই ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার মানকারচরে। ফজলুর রহমান ছিলেন ক্যাম্প কমান্ডার। ৪/৫ দিন পর হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য আমাদের তুরা পাহাড়ের পাদদেশে পাঠানো হয়। ৪২ দিন প্রশিক্ষণ চলে। প্রশিক্ষণ দেন শিখ সেনারা। জুন মাসে আমাদের প্রত্যেককে একটি হাতিয়ার দিয়ে গাইবান্ধার মৌয়ার চরে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। কমান্ডার ছিলেন শাজাহান মিয়া। তার নেতৃত্বেই শুরু হয় আমার সম্মুখ সমরে মুক্তিযুদ্ধ।’

১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন সিরাজুল ইসলাম বাদশা। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন মেজর আবু তাহের। কিশোরগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল এবং নগরবাড়ী-আরিচা থেকে ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদী ও তীরবর্তী অঞ্চল নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। প্রশিক্ষণের পর জুন মাসেই প্রথম অপারেশন করে শাজাহান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বাহিনী। সেখানে ছিলেন সিরাজুল ইসলাম বাদশাও। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথম অপারেশন করেছিলাম গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থানায়। সেখান থেকে অস্ত্র লুট করি। কান্তেরসর ব্রিজে তখন রাজাকারদের একটি ক্যাম্প ছিল। সেখানেও হামলা চালিয়ে আমরা ওদের অস্ত্র লুট করেছিলাম। জুলাইয়ের শেষদিকে চণ্ডিপুর স্কুলে হামলা চালিয়ে ১০ জন রাজাকারকে অস্ত্রসহ ধরে ফেলি। এদের একজন নিহত হয়। অন্য নয়জনই আমাদের সঙ্গে কথা বলার পর মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের মৌয়ার চর ক্যাম্পে নিয়ে যাই।’

শাজাহানের নেতৃত্বাধীন বাহিনী গাইবান্ধার মোল্লার চর, কাজীর চর, কামারজানিতেও যুদ্ধ করে। তবে সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয় অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে (শবেবরাতের রাত) গাইবান্ধা সদর থানার (বর্তমানে উপজেলা) নান্দিনা গ্রামের একটি যুদ্ধে। এ যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এ প্রসঙ্গে বাদশা বলেন, ‘শবেবরাতের রাতে গরু জবাই করে ডাক্তারবাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অথচ ওই এলাকা আগে থেকেই পাকিস্তানিদের দখলে ছিল। রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিভিন্ন ক্যাম্পের প্রায় ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা সেখানে যাই। একত্রিত হয়ে পাকিস্তানিদের আক্রমণ করাও আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। খাওয়া-দাওয়া হবে, ঠিক এই সময় আমাদের ওপর আক্রমণ চালায় পাকিস্তানিরা। এ পরিস্থিতিতে পাল্টা গুলি চালাতে চালাতে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে আসি আমরা। দুই-তিন দিন পর আমাদের গ্রুপের কয়েকজন মৌয়ার চর ক্যাম্পে এসে জানতে পারি, ওই ঘটনায় ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আর ডাক্তারবাড়ি থেকেই পাকিস্তানিদের খবর দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে একটি গভীর চক্রান্ত।’

বাদশার শেষ যুদ্ধ ছিল কামারজানিতে; সেখানেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘দিনটি ছিল ডিসেম্বরের ৫ তারিখ। গাইবান্ধা শহর থেকে উত্তরদিকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কামারজানি বন্দরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয় আমাদের। তখন সকাল ৭টা-৮টা হবে। ছনের বাগানের মধ্যে ছিলাম। পাকিস্তানি বাহিনী বোম্বিং করলে সহযোদ্ধা ফরহাদ আলীর ছেলে গোলাম রব্বানীসহ আমাদের পাঁচজন শহীদ হন। আমরাও পাল্টা ফায়ার করি। তাতে পাকিস্তানি বাহিনীরও কয়েকজন মারা যায়। আমি ছিলাম ওয়াপদা ব্রিজের আড়ালে। উঁচু-নিচু ডাল ছিল নদীর মধ্যে। সেখানে আক্রমণ হয় তিন দিক থেকে। সামনের দুই দিক থেকে পাকিস্তানিরা গুলি ছোড়ে। বিমান থেকে বোম্বিং করা হয়। এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিলাম না। হঠাৎ একটি গুলি এসে আমার বুকের বাম পাশে ঢুকে যায়। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে এই গোলাগুলি চলে। অবিরাম রক্ত ঝরছিল। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি, মেঘালয়ের রাজধানী শিলং সামরিক হাসপাতালে আছি।’

শিলং সামরিক হাসপাতালে বাদশা প্রায় তিন মাস চিকিৎসা নেন। সুস্থ হয়ে ১৯৭২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ট্রাকে সিলেট সীমান্ত হয়ে বাড়ি আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন গাইবান্ধার গোবিন্দপুর গ্রামের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সাঈদ। দেশে ফিরে সিরাজুল ইসলাম ফের পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালের ১ জুলাই কনস্টেবল পদ থেকে অবসরে যান। বর্তমানে ১২ হাজার টাকা নিয়মিত মাসিক মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান।

যুদ্ধাহত ভাতার জন্য আবেদন করলেও তা পাননি জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভাতা যা পাই, তা চিকিৎসার পেছনেই খরচ হয়ে যায়।’ তিনি জানান, সিএমএইচের পরীক্ষায়ও তার বুকে গুলি থাকার বিষয়টি ধরা পড়েছে। প্রতিবেদনও দিয়েছে। এ নিয়ে কয়েকবার ঢাকায় কল্যাণ ট্রাস্টে গিয়ে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দালালরা তার কাছে দেড়-দুই লাখ টাকা দাবি করেছে। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় এখন তিনি ঢাকায়ও আসেন না।

স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই। মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার বাড়ি করে দিচ্ছে। আমার থাকার জায়গা নেই। ঢাকা শহরে থাকার দরকারও নেই। গ্রামে ৫/৬ শতাংশ জমি আছে, এখানেই সরকার একটা ঘর করে দিক। শীতে কষ্ট না পেলেই খুশি থাকব। দুই-চার মাস বাঁচব, কি বাঁচব না- ঠিক নেই। বুড়ো-বুড়ি দু’জন একটু শান্তিতে মরতে চাই।’

এক ছেলের বাবা সিরাজুল ইসলাম। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অবসরের পর আমার যুদ্ধকাহিনী বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বলেছি। বুকে গুলি থাকার এক্সরেও কয়েকটি স্কুলে নিয়ে দেখিয়েছি। আমি চাই, তরুণ প্রজন্ম দেশটা কীভাবে স্বাধীন হয়েছে, সেটা জানুক।’

সুত্র- সমকাল

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..