• শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

নেত্রকোনা পূর্বধলায় প্রাণের টানে স্বেচ্ছায় রক্তদান

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ১৯১

ইকবাল হাসান, নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি: নেত্রকোনায় মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের স্বরূপ ‘স্বেচ্ছায় রক্তদান’। প্রয়োজনের সময় রক্ত পাওয়া এবং দূষিত রক্তের অভিশাপ থেকে মুমূর্ষু মানুষকে রক্ষা করার জন্যই প্রয়োজন নিরাপদ রক্তের। আর্থিক মূল্য দিয়ে এ দানের হিসাব কষা যায় না। এর সঙ্গে সম্পর্ক জীবনের। একান্তই মানবিক গুণ এটি। ভালোবেসে মানুষের জন্য যতগুলো কাজ করা যায় তার মধ্যে একটি স্বেচ্ছায় রক্তদান। দিন দিন স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ছে। বিশুদ্ধ রক্ত যেমন মানুষের জীবন বাঁচায়, তেমনি দূষিত রক্ত কেড়ে নেয় প্রাণ। জীবন বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ এ উপকরণটি যেমন সব মানুষ দিতে পারে না, তেমনি সব স্থান থেকে এটি সংগ্রহ করা যায় না কিংবা উচিতও নয়।

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে গঠন করেছেন রক্তমিতা ফোরাম নামে স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন। কথা হয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকুরিজীবি, কেউ শিক্ষক, কেউ সাংবাদিক, কেউ খেলোয়াড় ও কেউ ছাত্র। কাজের ফাঁকে যখনই সময় পান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন রক্তদানে। এ কাজটি করে মানসিকভাবে ভীষণ আনন্দ আর তৃপ্তি পান তারা। স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, কখনো নেত্রকোনা, কখনো ময়মনসিংহে ক্যাম্পের আয়োজন করে যাচ্ছেন। তারা জানান, ঈদ-পার্বণের ছুটি বা কোনো বিশেষ দিনক্ষণ নয়, মুমূর্ষু রোগী কিংবা নিয়মিত থ্যালাসেমিয়া রোগীর তো রক্তের ঠিকই প্রয়োজন। তাদের চাহিদা মেটাতেই আমরা স্বেচ্ছায় রক্তদানে সবসময়ই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছি।

জানা যায়, রক্তমিতা ফোরাম স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম চেষ্টা করে যাচ্ছে ময়মনসিংহ বিভাগের রক্ত চাহিদার লক্ষ্য পূরণের জন্য। দেশের নিয়মিত রক্তের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহের যে কোনো দুর্যোগ বা জরুরি প্রয়োজনে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে চাই তারা।

বাংলাদেশ এখনও স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি। বাংলাদেশে প্রতি বছর এখনো প্রায় ৮ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ রক্ত আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে, ৫৫-৬০ শতাংশ আসে রোগীর আত্মীয়-পরিজন-বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে এবং বাকি রক্ত আসে অসাধু পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের কাছ থেকে। আর এই অসাধু পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের অধিকাংশই রক্তবাহিত বিভিন্ন রোগ বিশেষত, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া এমনকি এইডস-এ আক্রান্ত। ফলে এই দূষিত রক্ত গ্রহণ করে রক্তগ্রহীতাও আক্রান্তহন দুরারোগ্য ব্যাধিতে; যা মোটেও কাঙ্খিত নয়।

রক্তের অভাবে প্রতি বছর বহু রোগীর প্রাণ সংকটের মুখে পড়ে। স্বেচ্ছায় রক্তদাতারাই এসব মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ান এবং এক ব্যাগ রক্তের মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটান। চিকিৎসকদের মতে, যাদের ওজন অন্তত ৪৫ কেজি, বয়স নুন্যতম ১৮, তারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে পারেন। প্রতি ৪ মাস অর্থাৎ ১২০ দিন পর পর রক্ত দেয়া যায়। এতে শরীরের ক্ষতি হয় না। তবে রক্ত দেওয়ার আগে চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবেন রক্ত নেওয়া যাবে কি না। এই অল্প সময়ে চাইলেই একজনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। সুস্থ সবল মানুষের প্রতি রক্তমিতা ফোরামের স্বেচ্ছাসেবীদের আহ্বান, মানুষের সেবায় আপনার হাতটা বাড়িয়ে দিন। নিয়মিত এক ব্যাগ রক্ত দিন।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে রক্তদান অত্যান্ত পুণ্য বা সওয়াবের কাজ। এটি এমন একটি দান যার তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ।’ ভগবেদে বলা হয়েছে, ‘নিঃশর্ত দানের জন্য রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদ ধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব।’ আসলে সব ধর্মেই রক্তদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় ইবাদত। কিছু মানুষ বলে থাকে, রক্ত দিলে তার অনেক ক্ষতি হবে, সে অসুস্থ্য হয়ে পড়বে এ ধারণা ভুল। নিয়মিত রক্তদাতার হার্ট ভালো থাকে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। ফলে দাতার হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদির ঝুঁকি কমে যায়। রক্তদানে দাতার শরীরের কিছু ভালো পরিবর্তন সাধিত হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। কোনো সেন্টারে একবার রক্তদান করলে ওই সেন্টার দাতার প্রয়োজনে যে কোনো সময় রক্ত সরবরাহ করে থাকে। রক্তদানের মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ বাড়ে। আপনার মনকে সহানুভূতিশীল করতে চাইলে আপনি স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে পারেন একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে। হয়তো আপনিই পারেন একটি শিশুর জীবন ফিরেয়ে দিতে। সচেতন সমাজের সবাইকে আহ্বান করছি “ফিরিয়ে আনুন একটি নিষ্পাপ প্রাণ” এবং “প্রাণের টানে স্বেচ্ছায় রক্ত দিন”।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..