• শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৪২ অপরাহ্ন

ভয়াল সে সময়ের খন্ড স্মৃতি (১৫ নভেম্বর ২০০৭)

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৫৪ বার পঠিত

মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন:

টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে ,হালকা হালকা করে বাতাস বইছে। স্কুল ছুটি হল তাড়াতাড়ি। কারণ বিটিভি তে বারবার বুলেটিন প্রচার হচ্ছে ১০ নাম্বার মহা বিপদ সংকেত।তখন একটি মাত্র টিভি চ্যানেল চালু ছিল গ্রাম এলাকায় । টেলিভিশন তাও আবার পুরো গাঁয়ে দু-তিনটির বেশি হবেনা। দিনটি ছিল ১৫ নভেম্বর ২০০৭ বৃহস্পিতাবার। স্কুলের ধারের দোকানের টিভিতে বারবার যখন প্রচার করা হচ্ছিল ১০ নাম্বার মহাবিপদ সংকেত আমরা তখন এসবের কিছুই বুঝতাম না । দোকান থেকে দু-টাকার বাদাম ভাজা নিয়ে বাড়িতে চলে গেলাম। বিকেল গড়িয়ে বেলা বাড়তে শুরু করল। ধীরে ধীরে বাতাসের বেগ ও বাড়তেছিল। মায়ের পীড়াপীড়িতে সন্ধ্যা বেলায়ই লাল শাক দিয়ে খেয়ে নিলাম সবাই।

দাদুর ঘর আমাদের ঘরের চেয়ে অনেকটা বড় হওয়ার জন্য মা বারবার বলছে দাদুর বাড়িতে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু আব্বা কিছুতেই রাজি হতে চাচ্ছিল না।বহু জোরাজোরির পর অবশেষে আমাদের কে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখি সেজো কাকারা ও বসে আছে। রাত ছিল প্রচন্ড অন্ধকার।আশেপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকানিতে যেটুকু দেখা যায় সেটুকুই। দাদুদের ঘরে এসে দেখলাম সেজো কাকা-কাকি দুজনেই পাশের বাসার বিল্ডিং এ যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। কিন্তু দাদা-দাদি কিছুতেই যাবেন না। তারা বারবার একই কথা বলে চলেছেন এত বড় ঘর কিছুই হবেনা।অন্যদিকে সেজো কাকা বারবার বলছে পানি উলহার হাট পর্যন্ত চলে এসেছে। কিন্তু দাদু-দাদি বা আমরাও কেউ তাদের কথায় পাত্তা দিচ্ছি না। আমাদের কারো কাছে রেড়িও কিংবা বাড়িতে লাইটের সিস্টেম ছিল না। ল্যাম্প-হারিকেন ব্যবহার করতাম। দাদু-দাদিকে না নিতে পেরে অবশেষে আমাদের পরিবার,সেজো কাকার পরিবার,ছোট কাকা,আর এক দাদুর পরিবার এবং বুড়ো মাঐ(দাদুর মা) কে আব্বা কোলে তুলে বৃষ্টি, ঝড় হাওয়ার মধ্যে নিভু নিভু হারিকেন নিয়ে অন্ধকার ডিঙ্গিয়ে আমরা ভাঙ্গা গাছগাছালির মধ্য দিয়ে গিয়ে পাশের বাসায় পৌঁছালাম।

দুটি বিল্ডিং এর একটিতে মাঐ এবং সেজো কাকাদের আশ্রয় হল।মাঐ কে নিরাপদ স্থানে রেখে । আমরা পাশের বিল্ডিং এ আশ্রয় নিতে গেলাম কিন্তু সেটি বহু দিন ধরে কেউ ব্যবহার না করার ফলে তিনটি দরজার একটি তালা খোলা যাচ্ছিল না। আর একটি দরজা ভিতরে ঢুকে খুলতে পারলে তাতে ঢুকা যাবে।আর অন্য দরজাটির ভিতর দিয়ে যদি ও ঢুকা যেত কিন্তু সেখান দিয়ে ঢুকলে যে রুমটি পাওয়া যেত সেটি পারসোনাল রুম হওয়ায় চাবি দেয়া হল না।ক্রমশ বাতাসের বেগ বেড়েই চলছে । দেয়াল ডিঙ্গিয়ে আব্বা রুমের দরজা খুলল আমরা সবাই টিনশেট বিল্ডিং এর রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম।চারদিকে শুধু গাছপালা চুড়মার করে ভেঙ্গে পড়ছে। বাতাসে দরজা ভেঙ্গে ফেলতে চাচ্ছে। আমাদের পাশে একটি কাঠের বারান্দা ছিল সেটি ভেঙ্গে পড়ে যে দরজা টি খুলা যেত তাও আটকে গেল। এখন কি উপায়?পানিতে ডুবে মরলেও রুম থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। অনেক চিল্লা চিল্লি করার পর অবশেষে পাশের বিল্ডিং থেকে সাড়া দিয়ে চাবি দিল।

ওদিকে দাদু-দাদি তারা যখন দেখতেছিল তাদের ঘরের চালা উড়ে যাচ্ছে তখন তারাও ভয়ে এখানে আশার জন্য বের হয়ে ভেঙ্গে পড়া গাছের মধ্যে আটকে পড়ে অন্ধকারে কাঁদতে শুরু করল, জোরে জোরে চিল্লাতে লাগল , আওয়াজ শুনে বুঝতে পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট কাকা এবং আব্বা দুজনে চারদিকে ঘরবাড়ি-গাছপালা ভেঙ্গে পড়ছে,বৃষ্টি পড়ছে, অন্ধকারের এর মধ্যে দিয়ে অন্ধ মানুষের মত মাঝে মাঝে বিজলি চমকানোর আলোতে তাদের হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে নিয়ে আসল। আমার ছোট ভাই ভয়ে বমি করে দিল ফ্লরে। আস্তে আস্তে আরো অনেকে আশেপাশের লোকজন আমাদের এ বিল্ডিং আসতে লাগল। তাদের কাছে ঘরবাড়ির অবস্থা জানতে চাইলে বলতে লাগল অমুকের ঘর ভেঙ্গে গেছে,অমুকের ঘর ভেঙ্গে গেছে…….।। সারারাত ঘুমাতে পারলাম না আমার বয়স ও তখন বেশি না ক্লাস ফোরে পড়ি তখন । সকাল হওয়ার আগেই টয়লেটের খুব চাপ দিল কিন্তু ঘর নেই,আবার টয়লেট খুঁজি কোথায়? কোনোরকমের গাছের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ডোবার পাশে খোলা আকাশের নিচে টয়লেট করতে বাধ্য হয় , ঘটি ছিল না, পুকুরেই ধু’লাম। ঘর নেই, গাছপালা ভেঙ্গে পথ ঘাট সব বন্ধ, হাঁটার কোনো উপায় নেই।

আমাদের গ্রামেরই ১০০ টির উপরে ঘর ভেঙ্গে গেছিল।

ভোর হতেই শুনলাম পাশের বাসার চাচাতো বোন ঐ সময়ে সাউথখালীতে ছিল,বেঁচে আছে কিনা খবর নেই। সে যেখানে ছিল খবর আসল তাদের সে আত্মীয়দের অনেকেই মারা গেছেন। এদিকে পাশের আর এক বাসা থেকেও একজন ঐ সময়ে জঙ্গলে গোল কাটতে গেছিল। সেজো কাকার শ্বশুর ও ছিল তখন জঙ্গলে। তাদের খুঁজতে তাদের পরিবার-আত্মীয় স্বজন বের হল। একজনের লাশ পর দিন পাওয়া গেল এবং অন্যজনের সপ্তাহখানেক পরে গলিত লাশ খুঁজে পাওয়া গেল। সাউথখালী-গাবতলা-সোনাখালী এলাকায় ওয়াপদার পাড়ে লাশের পর লাশের কবর , ধান ক্ষেতের ভিতর লাশ আর লাশ পড়েছিল। এমনকি এক গোষ্ঠীর ২৬ জন হারিয়ে ২৬ জনের গনকবর দিতে হয়েছিল। আমরা যদিও সে বারের মত বেঁচে গেলাম। অনেকে বলতে লাগল বাতাসের যে ধাক্কাটিতে বাঁধ ভেঙ্গে পানি উঠেছিল, সেটি দুমিনিটের বেশি স্থায়ী ছিল না। আর মাত্র আধ মিনিটের মত থাকলে আমরাও ভেসে যেতাম।

সিডর শেষ হল, অনেকের অনেক কিছু হারালো । আবার অনেকে সম্পদের পাহাড় গড়ল। মেম্বারদের বাড়িতে ও পাকা বিল্ডিং উঠল।
তবে দেশের সম্পদের যে পরিমাণ ক্ষতি হল এক রাতে, তা শত বছরেও ঘুঁচবে না। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে রিং বাঁধের কাজ চলছে শরণখোলায় । আর কখনো হয়ত আমরা এরকম রাত আমরা দেখব না ,দেখতে চাইনা। যা জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়।

(বিশাল সেই ইতিহাস থেকে আজ সংক্ষেপে ২০১৮ সালে লেখা….)

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..