• শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৪৪ অপরাহ্ন

শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৬৩ বার পঠিত

প্রদীপ কুমার দেবনাথ,

হাতছানি দেওয়া লোভনীয় চাকরি ছেড়ে শৈশবের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলাম সেই ২০০২ সালে। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো। খুব ভালো লাগতো শিক্ষার্থীদের পড়াতে, বুঝাতে। রাত জেগে তৈরি লেখতাম একটির পর একটি নোট, তৈরি করতাম একটি গ্রামাটিক্যাল রুলের অসংখ্য এক্সামপল। কিভাবে ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীকেও পাঠে মনযোগী করবো, কত সহজ করলে সে শিখতে পারবে ? কি করলে তার মনে থাকবে ? কিভাবে শিখালে সে নিজে তৈরি করতে পারবে ? শুধু এ ভাবনাগুলোই কাজ করতো মনের মধ্যে।

আমার নিজস্ব পদ্ধতিগুলো শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করলো সাদরে। একটা সাড়া পড়ে গেল ভালো শিক্ষক হিসেবে। আরো বেশি আন্তরিক হলাম। স্ত্রী সন্তান বা অন্য কেউ না থাকায় শুধু বিদ্যালয় এবং নিজের পেশাগত উন্নতিই ছিল ভাবনার কেন্দ্রে।
পাঁচ বছর এভাবেই কাটলো। তারপর বিয়ে করলাম। দুটো চিন্তা মাথায় ভর করলো শিক্ষকতা আর নিজের পরিবার। আগে যেখানে মাসে এক কি দুবার কিছু বাজার করতাম অথবা অভিভাবকের হাতে অল্প কিছু টাকা দিতাম বিয়ের পর সেটা অতীত হয়ে গেল। শুরু হল প্রতিদিন বাজারের ব্যাগ টানা, ঘরের জন্য নানারকম জিনিসপত্র কেনা। মাথায় প্রচণ্ড টেনশন শুরু হল এত অল্প টাকায় বাকীদিনগুলো চলবে কেমনে?

মাথা থেকে হারিয়ে যেতে থাকলো বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী আর সৃজনশীলতা। শুধুই অর্থ উপার্জনের নেশা চেপে বসলো মাথায়। কিভাবে অধিক আয় করা যায়? যে প্রাইভেটকে পায়ে ঠেলে দিতাম তাই একসময় উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিলাম।
কিন্তু গ্রামের স্কুলের প্রাইভেটেও সুখ নাই। অনেকেই দরিদ্র কিন্তু মেধাবী থাকায় বিনা টাকায়ই পড়াতে লাগলাম। অনেকেই একে ভাল চোখে দেখতনা। চলতো চক্রান্ত। অবিরত মোকাবিলা করতে হতো নানারকম ঝামেলা। প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, মানসিক, পারিবারিক সকল প্রতিবন্ধকতা সামাল দিয়ে বিদ্যালয়ে আন্তরিক হওয়ার বৃথা অভিনয় করতে লাগলাম। এরই মধ্যে দু’সন্তানের বাবা হলাম। চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগলাম। শিক্ষকতা আর শখের পেশা রইল না। মাথায় শুধুই পরিবার চালানোর চিন্তা। বউয়ের সবসময় একটাই আর্জি সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করো, টাকা জমাও।

যেখানে পরিবার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি প্রতিনিয়ত কি করে জমাবো টাকা ! একবার ভাবি ব্যবসা করবো আবার ভাবি অন্যকিছু করবো। সঠিক কিছু মাথায়ও আসেনা।

চাকরি ছেড়েও অন্যকিছু করতে পারছিনা। সরকারি চাকরির বয়স শেষ। জমানো অর্থও নেই, বাপ – দাদার দেওয়া বিপুল সম্পত্তিও নেই। তাই, আর কিছু করার উপায়ও নেই। থাকলে এ চাকরি সালাম দিয়ে ছেড়ে দিতাম।
আমাদের কষ্টের কথা, দৈন্যতার কথা, দুঃখের কথা কাউকে বলতে পারিনা। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে সমাজে দূর্বল মানুষ হিসেবে আমরা পরিগণিত।

অথচ আমাদের জাতির বিবেক, জাতি গঠনের কারিগর, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে উপহাস করা হয়।
আবার অনেক সময় পাবলিক সেন্টিমেন্ট আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়।
দায়িত্ব নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাদের নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাই তারা আমাদের কথা বলতে লজ্জা পান। যদি দু’একজন বলেন অন্যরা হাসাহাসি, উপহাস, বিদ্রুপ করেন।

অথচ আমাদের পাশ্ববর্তী ধনী দরিদ্র সকল দেশই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করেন, শিক্ষাখাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। তারা জানেন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত জনসমষ্টি আগামীর দক্ষ নাগরিক। এরাই ভবিষ্যতে দেশের কাণ্ডারী হবে, দেশ ও জাতিকে দেখাবে সত্য, সুন্দর ও সঠিক পথ। আমাদের সে লক্ষ্য থাকলে স্বাধীনতার এতবছর পরও অশিক্ষিত লোক দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, মহান জাতীয় সংসদ, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনা করতে হতনা।
দুঃখজনক হলেও সত্য শত সহস্র চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যে মহানায়ক এদেশটিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের প্রায় ৯২% প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের কর্তব্যরত ব্যক্তিরা বেসরকারি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আরো ৪৫ বছর আগেই এসব সরকারি হয়ে যেত।

৯২% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি রেখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা কোন দিনই গড়া সম্ভব হবেনা। সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই। আর সোনার মানুষ গড়তে মেধাবী শিক্ষক চাই।
শিক্ষকদের যে বেতন ভাতা তাতে কখনো মেধাবীরা এ পেশায় আসবে না, প্রয়োজনে হাঁস-মুরগি, গরুছাগল, কৃষিকাজ কিংবা ব্যবসা করবে। মেধাবীদের এ পেশায় আকর্ষণ না করাতে পারলে অন্তঃসারশূন্য জাতি গড়ে উঠবে।
এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ না করলে অচিরেই সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অচলাবস্থা দেখা দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আমলা, কিছু সংখ্যক জ্ঞানপাপী বুদ্ধিজীবী ও ১০% শহুরে শিক্ষকরা জাতীয়করণের অন্তরায়। সরকারকে এটা অনুধাবন করতে হবে।

হাইব্রিড রাজনৈতিক নেতার মতো হাইব্রিড আওয়ামীপন্থী ( তথাকথিত) আমলারা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বারোটা বাজাচ্ছে। উনাদের উদ্দেশ্য শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমলাদের বাদ দিয়ে একটি সঠিক কমিটি গঠন করে যাচাই করা উচিত এদেশের শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা করা কতটা জরুরি। মনে রাখতে হবে শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।

জাতীয়করণের মাধ্যমেই ঝিমিয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থায় গতিশীলতা আসবে, প্রাণ ফিরে পাবে প্রতিষ্ঠানগুলি। এতে তৈরি হবে দক্ষ শিক্ষার্থী, দক্ষ নাগরিক ও নিশ্চিত হবে জাতির ভবিষ্যৎ।

শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..