• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণা

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৯
  • ২৯ বার পঠিত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ছবিতে আক্রান্ত দুই

অফিস ডেক্স-
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ছবিতে আক্রান্ত দুই

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এ হামলা হয়। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিকেল ৫টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত রাত সাড়ে ১১টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের পাশের রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। এর আগে রাত ৮টার দিকে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের কাছে। বাসভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাত ৮টার পর পরিবহন চত্বর থেকে সরে যান।

রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পাঁচটি ছাত্রী হলের কিছু সংখ্যক ছাত্রী তালা ভেঙে বিক্ষোভে এসে যোগ দেন। প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করে অনেক ছাত্রী হলে থেকে যান।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাত ৯টার দিকে মাইকিং করে পরিবহন চত্বর, বটতলাসহ ক্যাম্পাসের সব খাবারের দোকান বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেয়।

আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাতে শিক্ষক সমিতি থেকে পদত্যাগ করেছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ চার সদস্য।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রায় তিন মাস ধরে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে রেখেছিলেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল সোয়া ১১টার দিকে উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক-কর্মকর্তারা তাঁকে বাসা থেকে বের করে কার্যালয়ে নিয়ে যেতে আসেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাঁদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। তখন তাঁরা আন্দোলনকারীদের

মুখোমুখি অবস্থান নেন। এ সময় উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বাগিবতণ্ডা শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে সংগঠনের একটি মিছিল ঘটনাস্থলে এসে অবস্থান নিতে গেলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাঁরা এলোপাতাড়ি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাথি-কিল-ঘুষি মেরে ছত্রভঙ্গ করে দেন। এ সময় একাধিক শিক্ষকসহ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। হামলার সময় উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক সোহেল আহমেদ, নাসির উদ্দিন, আতিকুর রহমান, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান জনিসহ কয়েকজনকে ‘ধর ধর’ ও ‘মার মার’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে। হামলা চলাকালে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের নীরব ভূমিকায় দেখা গেছে।

হামলাকারীরা উপাচার্যবিরোধী শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সেখান থেকে হটিয়ে দিয়ে ওই জায়গায় অবস্থান নেন। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও তাঁর সমর্থক শিক্ষকদের নিয়ে উপাচার্য ফারজানা ইসলাম পুরনো প্রশাসনিক ভবনে তাঁর নিজ কার্যালয়ে যান। সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পর তিনি নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে যান। সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো হামলা হয়নি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলনকারীদের আমার বাসভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছে।’ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিয়ে তাঁকে ‘মুক্ত’ করার জন্য ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য।

উপাচার্য আরো বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমকে তারা (আন্দোলনকারীরা) অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়েছে, মিথ্যা বলেছে। আজ মানুষের জেগে ওঠা আমরা দেখেছি। আমার সহকর্মী-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব ছাত্র-ছাত্রী বিশেষ করে ছাত্রলীগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে।’

হামলায় আহতদের মধ্যে আছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফ মোজাম্মেল, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মাহাথির মুহাম্মদ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাইমুম ইসলাম, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের রাকিবুল ইসলাম রনি, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শাকিল উজ্জামান, ইংরেজি বিভাগের আলিফ মাহমুদ, অর্থনীতি বিভাগের উল্লাস, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সৌমিক বাগচী, দর্শন বিভাগের রুদ্রনীল, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ছাত্রী ছন্দা ও সাউদা, প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাইদুল ইসলাম, বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আজাদ, যমুনা প্রতিদিনের প্রতিনিধি ইমরান হোসাইন হিমু, বাংলা লাইভ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান উজ্জল।

আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ১২ জনকে সাভারের বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. রেজওয়ানুর রহমান। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর বলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে।

হামলার কথা অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা কালের কণ্ঠকে বলে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমার জানা মতে কোনো শিক্ষক আহত হননি। বরং শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সুন্দরভাবে সরিয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস চাই। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।’

তবে ছাত্রলীগের এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্দোলনে কোনো শিবিরসংশ্লিষ্টতা নেই। যেকোনো শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য শিবির ব্লেইম দেওয়াটা পুরনো অপকৌশল। বুয়েটের আবরারকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে, এখানেও একইভাবে অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ. স. ম. ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে মব তৈরি হয়েছিল। চেষ্টা করেও আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বড় ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর আছি।’

হামলার ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ বিকেলে কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পাস শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।

গত রাতে শিক্ষক সমিতির পদ থেকে পদত্যাগ করা শিক্ষকরা হলেন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. সোহেল রানা, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিন, সদস্য অধ্যাপক মাহবুব কবির ও অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস।

অধ্যাপক সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হামলায় ছাত্র-শিক্ষক উভয়ই আহত, লাঞ্ছিত ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। বিষয়টিকে শুধু দুঃখজনক বলেই আখ্যা দিতে পারলাম, এর বেশি কিছু করতে পারলাম না। একটা নিন্দা প্রস্তাব পর্যন্ত নিতে পারি না। বিচার চাইতে পারি না। তাই শিক্ষক সমিতিতে পদ আগলে রাখার কোনো মানে হয় না।’

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষক, শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রলীগের হামলাকে ‘নগ্ন হামলা’ উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। সংগঠনের সভাপতি সোহেল রানা ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে হামলাকারীদের শাস্তি ও উপাচার্যের পতদ্যাগ দাবি করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ সক্রিয় নেতৃত্ব দিচ্ছে দাবি করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উসকে দিয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মারধরে জড়িত ছিল কি না খতিয়ে দেখছি।’

ভর্তি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা : বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করায় ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ভর্তি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৩ নভেম্বর থেকে অনলাইনে বিষয় নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলবে ৯ তারিখ পর্যন্ত। তবে ক্যাম্পাসে হাজির হয়ে বাকি ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়গুলো আপাতত বন্ধ থাকবে জানিয়ে পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব আবু হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দুই-এক দিনের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাব।’কালের কণ্ঠ

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..