• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৪৭ পূর্বাহ্ন

রানি রাসমণির বাড়ি গান গেয়েছিলেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি!

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৪০ বার পঠিত

উজ্জ্বল রায়

নানা রীতির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য রীতি হল কুমারী পুজো। এই কুমারী পুজো করা হয় অষ্টমী। আবার নিয়মভেদে কোথাও নবমীতেও করা হয়। আবার কোথাও দু’দিন ধরে চলে তা। তবে বাংলায় শুধুমাত্র একটি বাড়িতেই তিন দিন ধরে কুমারী পুজো করা হয়, তা হল ঐতিহ্যশালী রানি রাসমণির জানবাজারের বাড়ির পুজো। আজ থেকে ২০০ বছরেরও বেশি কাল আগে, ১৭৯৪ সালে পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন রানি রাসমণির শ্বশুরমশাই জমিদার এবং ব্যবসায়ী প্রতীরাম মাড়। এরপর রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর পুজোর হাল ধরেন রানি নিজেই। তাঁর আমলে এই পুজো করা হত রীতিমতো জাঁকজমকের সঙ্গে। সারারাত ধরে চলত যাত্রা, কবিগানের আসর।

কথিত আছে, বিখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিও নাকি এই বাড়িতে অনুষ্ঠান করে গেছেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়ের বহু কিংবদন্তি এবং বরেণ্য মানুষও এ বাড়ির পুজোয় নিয়মিত এসেছেন। প্রাচীন রীতি মেনে আজও এখানে দেবী দুর্গার সঙ্গে পঞ্চ মহাদেব, রঘুবীর, রামকৃষ্ণ এবং সারদার পুজো করা হয়। কারণ হিসেবে জানা গিয়েছে, ১৮৬৪ সালে রামকৃষ্ণদেব এই পুজোতে এসেছিলেন এবং ‘সখীবেশ’ ধারণ করে পুজোও করেছিলেন তিনি। সন্ধ্যা আরতির সময়ে মা দুর্গাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করেছিলেন, যা দেখে মথুরবাবু ভেবেছিলেন, তাঁর স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে কোনও মহিলা বোধহয় মা দুর্গাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করছিলেন। পরে তিনি জগদম্বা দেবীর থেকে জানতে পারেন, স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব ভাবোন্মাদ হয়ে বাতাস করেছিলেন। সেই থেকেই এই পুজোতে আজও ঠাকুরদালানে বাড়ীর মহিলারা প্রতিমার বাঁ দিকে এবং পুরুষেরা ডান দিকে দাঁড়ান।

আজ অবশ্য জানবাজারের পুজোয় পশুবলি বন্ধ। বাকি অন্যান্য প্রাচীন পুজোর রীতি চলছে একইভাবে। রানি রাসমণির বাড়ীর দুর্গা প্রতিমাতেও আছে বিশেষত্ব। দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মুখের রং একে অন্যের থেকে আলাদা। দেবী এখানে ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা’- অর্থাৎ তাঁর মুখের রং শিউলি ফুলের বৃন্তের মতো। মূর্তি এখানে একচালা, কারণ দেবী একান্নবর্তী পরিবার পছন্দ করেন। বংশ পরম্পরায় রানি রাসমণির বাড়ির প্রতিমা তৈরি করছেন লালু চিত্রকর এবং তাঁর ভাই দুলাল চিত্রকর। এঁদের বাড়ি আহমেদপুর। দেবীর বোধন হয় প্রতিপদে, অর্থাৎ মহালয়াতে। রানি রাসমণির বাড়ীতে দুর্গার সঙ্গে পুজো করা হয় মহাদেবেরও। দশমীতে দেবীর মূর্তির সঙ্গে মহাদেবের মূর্তিও বিসর্জন দেওয়া হয়। এই পুজোতে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, তিন দিন ব্যাপী কুমারী পুজো চলে। এই ভোগের প্রসাদ সবাই পেয়ে থাকেন। আজও এখানে পুজোর ক’দিন সারা রাতব্যাপী যাত্রা ও কবি গানের লড়াই-এর আসর বসে। এ বছর পঞ্চমীর দিন বেলা তিনটেয় জানবাজারের বাড়ীতে রানি রাসমণির নবনির্মিত মূর্তি উন্মোচন করেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ সুপর্ণানন্দজি।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..