• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন

নারীর প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেসের সমাধানে এগিয়ে আসতে পারেন তার সঙ্গী

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯
  • ৫৮ বার পঠিত

অনেক নারী তার মেনস্ট্রুয়েশন বা ঋতুস্রাবের আগে অনেক শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ অনুভব করেন। এটি প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেস বা প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম সাধারণত সংক্ষেপে পিএমএস (PMS) নামেও পরিচিত। প্রায়ই এই স্ট্রেস তাদের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা বা রাগ দ্বারা প্রকাশিত হয়। কিছু কিছু সময়ে নারীরা তাদের সঙ্গীর উপর এই স্ট্রেসের প্রভাবে এতটাই রাগ করেন যে তারা সঙ্গীকে ছেড়ে চলে যেতে চান।

সাম্প্রতিককালে প্লস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, নারীর সঙ্গী তার পিএমএস উপসর্গ বৃদ্ধি না করে বরং হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, কাপলদের মাঝে কাউনসেলিং এর মাধ্যমেই তাদের মধ্যে থাকা মাঝারি থেকে তীব্র প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিম্পটম কমে যেতে পারে, এবং সম্পর্কের সন্তুষ্টি বা রিলেশনশিপ সেটিসফেকশনও এর মাধ্যমে বেড়ে যেতে পারে।

সম্পর্কে সমস্যা

প্রায় ৪০% নারী ঋতুস্রাবের তিন থেকে চার দিন পূর্বে মডারেট থেকে সিভেয়ার প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেসের কথা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে সর্বাধিক সাধারণ লক্ষণগুলি হল বিরক্তি, রাগ, বিষণ্নতা, কখনও কখনও ক্লান্তি, পিঠের ব্যথা এবং মাথা ব্যাথা।

এই উপসর্গগুলো হচ্ছে হরমোনাল চেঞ্জ বা হরমোন পরিবর্তন এবং লাইফ স্ট্রেস বা দৈনন্দিন চাপের সমন্বিত ফলাফল। উপসর্গগুলোর তীব্রতা নারীর মধ্যে থাকা কোপিং স্ট্র্যাটেজি বা এঁটে ওঠার কৌশলসমূহ এবং তাদের সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কোপিং বলতে বোঝায় ব্যক্তিগত ও নিজের আভ্যন্তরীর মানসিক সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য কোন ব্যক্তির নিজের সচেতন প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্ট্রেস ও কনফ্লিক্টগুলো নিয়ন্ত্রনে আনেন, সহ্য করতে পারেন বা কমিয়ে ফেলতে পারেন। কোপিং স্ট্র্যাটেজি বলতে কোপিং করার জন্য কৌশলগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলো ব্যক্তির নিজের মধ্যেই বিকশিত হয়। যেসব নারী তাদের প্রিমেনস্ট্রুয়াল পরিবর্তন স্বীকার করেন, নিজের যত্নে নিয়োজিত থাকেন এবং এর জন্য সঙ্গীর থেকে সাহায্য চান তাদের বেলায় চরমমাত্রার প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেস তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

পিএমএস অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নারীদের সাক্ষাৎকার নিলে দেখা যায়, তারা তাদের সম্পর্কের উপাদানগুলোর দ্বারা অসন্তুষ্ট, তা সেই উপাদান ইমোশনাল সাপোর্ট বা আবেগজনিত সমর্থনের বেলাতেই হোক, আর দিনের শেষে সিংকে এক গাদা বাসন রেখে দেয়াই হোক।

যে সব নারী মাঝারি থেকে গুরুতর প্রিমেনস্ট্রুয়াল চাপ ভোগ করেন, তারা যদি এটাকে অবদমিত বা উপেক্ষা করে থাকেন তবে তাদের জন্য এই সমস্যাগুলো প্রতি মাসে তিন সপ্তাহের জন্য থেকে যেতে পারে। কিন্তু যে এক সপ্তাহের সময়, যখন নারীরা নিজেদেরকে বেশি সংবেদনশীল এবং বিপদশঙ্কুল বলে মনে করেন, তখন এগুলো খুব বেশিই হয়ে যায়।

এই অবদমিত রাগ এবং বিরক্তি অবশেষে তার বয়েলিং পয়েন্টে পৌঁছে যায়, আর তখন নারীরা মনে করেন যে তারা আর নিয়ন্ত্রণে নেই। এর ফলে ভীষণ যন্ত্রণা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের সৃষ্টি হতে পারে।

কিভাবে থেরাপি সাহায্য করে?

আমরা ইতিমধ্যেই জানি যে ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেসের উপসর্গ কমাতে পারে। ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি বলতে বোঝায় কোন থেরাপিস্টের সাথে একা একা গিয়ে সাক্ষাত করা যার দরুন আভ্যন্তরীন দুর্দশা বা ইন্টারনাল সাফারিং কমে যায়, যেখানে এই ইন্টারনাল সাফারিং কোন সমস্যাগ্রস্ত আচরণ তৈরি করে থাকে। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য থাকে নারীর এই উপসর্গগুলোর উৎস্য তাকে বোঝানো এবং তার মধ্যে কোপিং স্ট্র্যাটেজির বিকাশ ঘটানো। নিজের যত্নের জন্য সময় করে নেয়া, দ্বন্দ্ব এড়ানো, সমর্থনের জন্য প্রয়োজনগুলো প্রকাশ করা এবং জীবনের চাপ কমানো এর আওতাভুক্ত হতে পারে।

যদিও চিকিৎসা যেমন এন্টিডিপ্রেসেন্ট হিসাবে এসএসআরআই (selective serotonin re-uptake inhibitors) নারীদের প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেস মোকাবেলা করতে সাহায্যকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, সাইকোলজিকাল থেরাপি দীর্ঘমেয়াদে এর চেয়েও বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে নারী নিজে থেকেও নিজের সাহায্য করতে পারে। তিনি একজন থেরাপিস্টের সাথে কথা বলার পরিবর্তে কিভাবে পিএমএস এর মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে লিখিত ম্যানুয়ালগুলো পড়ে নিজেকে সামলাতে পারেন।

যদিও প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেস এর জন্য থেরাপির ক্ষেত্রে সম্পর্কজনিত সমস্যাগুলো বিবেচনা করা হয়, তবুও এই সেশনগুলোতে নারীদের সঙ্গীরা সরাসরিভাবে জড়িত থাকেন না। এটি একটি গুরুতর ভুল। অনেক পুরুষ বলেন, তারা পিএমএস বুঝতে পারেন না। তারা তাদের সঙ্গীকে সহায়তা করতে চান, কিন্তু কী করতে হবে তা তারা জানেন না।

অন্যেরা আবার তাদের সঙ্গীর মধ্যে এই সিম্পটমগুলো দেখে তাকে উপেক্ষা করা শুরু করেন। এটা হলে নারী তখন নিজেকে উপেক্ষিত বলে মনে করেন, এতে প্রিমেনস্ট্রুয়াল চাপ আরও খারাপ আকার ধারণ করে।

সমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেসের বেলায় নারীরা তাদের সঙ্গীদের থেকে বেশি সমর্থন এবং সহায়তা পেয়েছেন। এই সহায়তার ফলে প্রিমেনস্ট্রুয়াল স্ট্রেস এর লক্ষণ কম দেখা যায় ও তারা খুব সহজেই বিষয়টির সাথে এঁটে উঠতে পারেন। যেসব পুরুষ সঙ্গী সহায়তা দান করেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।

কাপলস থেরাপি আরো ভাল

সাম্প্রতিক গবেষণায়, থেরাপি দরকার এরকম ব্যক্তিদের একটি কনট্রোল গ্রুপ নিয়ে তাদের উপর ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি ও কাপলস থেরাপির মধ্যে তুলনা করা হয়। কাপলস থেরাপিতে উভয় সঙ্গীকেই অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এই তুলনামূলক পর্যালোচনার ফলাফলটি নির্দেশ করে, সম্পর্ক উন্নয়নে এবং প্রিমেনস্ট্রুয়াল সংকট দূর করার জন্য কাপল-ভিত্তিক থেরাপি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়।

তিন বছর ধরে এই গবেষণায় ৮৩ জন নারীকে যুক্ত করা হয়েছে যারা মাঝারি থেকে গুরুতর পিএমএস ভোগ করেছেন। তাদেরকে এলোমেলো বা যাদৃচ্ছিকভাবে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত করা হয়: একটিতে ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি গ্রুপ, একটিতে কাপলস থেরাপি গ্রুপ এবং আরেকটিতে ওয়েটিং লিস্ট গ্রুপ। ওয়েটিং লিস্ট গ্রুপ দ্বারা সেই গ্রুপ বোঝায় যাদেরকে গবেষণার ফলাফল জানার উদ্দেশ্যে গবেষণার সময় কোন চিকিৎসা না নিয়ে থাকতে বলা হয়। চিকিৎসা না নেয়ার ফলে এদের সাথে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে একটি তুলনা করা যায়। গবেষণার পর তারা চিকিৎসা নেন। এই পর্যালোচনায় বেশিরভাগ ব্যক্তিই (৯৫%) বিষমকামী সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন।

দুইটি থেরাপির গ্রুপের নারীদেরকেই ওয়েটিং লিস্ট কনট্রোল গ্রুপের তুলনায় কম প্রিমেনস্ট্রুয়াল লক্ষণ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এখান থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, থেরাপি যেরকমই হোক, তা কার্যকরীই হয়।

যাই হোক, কাপল থেরাপি গ্রুপের নারীদের মধ্যে ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি গ্রুপের নারীদের তুলনায় অধিক ভাল আচরণগত কোপিং স্ট্র্যাটেজি দেখা গেছে। কাপলস থেরাপি গ্রুপের নারীদের মধ্যে ৫৮% নারীর ক্ষেত্রে নিজের যত্ন নেয়া ও কোপিং এর বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপি গ্রুপে এই হার ২৬% এবং ওয়েট লিস্ট গ্রুপে এই হার ৯% ছিল।

কাপলস থেরাপি গ্রুপের (৫৭%) মধ্যে বেশিরভাগ নারী তাদের সঙ্গীর সঙ্গে একটি উন্নত সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে জানান। ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপির বেলায় এটি ২৬% ছিল, এবং ওয়েট লিস্ট গ্রুপের ক্ষেত্রে এটা ছিল ৫%।

কাপলস-থেরাপি গ্রুপে ৮৪% নারী তাদের পিএমএস বিষয়ে সঙ্গীর অধিকতর সচেতনতা সম্পর্কে জানান। ওয়ান-অন-ওয়ান থেরাপির বেলায় এটা ৩৯% এবং ওয়েট-লিস্ট গ্রুপে এটি ছিল ১৯%।

পুরুষ সমাধান অংশ হতে পারে

থেরাপি সেশনগুলির পর নারীরা জানান, তারা পিএমএস এর সময় কম পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। এখন তাদের মধ্যে সম্পর্কের সংঘাতের সম্ভাবনা বিষয়ে অধিক সচেতনতা কাজ করে, সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন কম সমস্যার এবং সঙ্গীর সাথে তারা পিএমএস সম্পর্কে বেশি কথা বলেন এবং সাপোর্ট চান।

গবেষণাটিতে উভয় থেরাপি গ্রুপেই নারীর উন্নতি স্পষ্ট ছিল। এই গবেষণাটি নির্দেশ করছে যে, সঙ্গী যদি নারীর সাথে নাও থাকে, তবুও থেরাপি থেকে ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া যেতে পারে। একজন নারী তারপরও নিজের যত্ন নেয়া এবং কোপিং স্ট্র্যাটেজি শিখতে পারেন, পিএমএস সম্পর্কে ভাল ধারণা নিতে পারেন, এবং বাসায় গিয়ে তার সঙ্গীকে থেরাপিতে তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানাতে পারেন।

যাই হোক, এই গবেষণায় ফলাফল স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, নারীর পিএমএস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি ইতিবাচক ফলাফল তখনই পাওয়া যায় যখন থেরাপিতে নারীর সাথে তার সঙ্গীও অংশগ্রহণ করেন। পুরুষেরা নিজেদেরকে তাদের সঙ্গীর পিএমএস এর জন্য দায়ীও ভাবতে পারেন। কিন্তু তারা কেবল তাদের সঙ্গীর এই সমস্যার কারণ না হয়ে তার সমাধানের একটা অংশও হতে পারেন।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..