• শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

আল্লাহ সবার কোরবানি কবুল করুন-এম,এ,কাশেম পাপ্পু

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৯
  • ৭১ বার পঠিত

বিশ্ব জাহানের মুসলমান ধর্ম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব সমাগত। পবিত্র জিলহজ মাসের চাঁদের হিসেবে ইংরেজি আগস্ট মাসের ১১ তারিখে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকায়। আসলে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে মুসলমানরা মক্কা-মুনওয়ারায় হজ পালন করেন এবং ১০ তারিখে কোরবানি দেন। আসলে মুসলমানদের সব ধর্মীয় কর্তব্যই পালিত হয় চাঁদের হিসেবে।

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলমানরা বহু প্রাচীন এক মহান ইতিহাসের অনুসরণে উদযাপন করে। এই ইতিহাসের শুরু হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পরমপ্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.) চরম এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে, যে পরীক্ষা ছিল আল্লাহ পাকের নির্দেশে। এবং সেই পরীক্ষায় পিতা-পুত্র দুজনই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তার পর থেকেই কোরবানি মুসলমানদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ পালনীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। যত দিন ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমান এ ধরাধামে থাকবে তাদের ওপর শর্ত সাপেক্ষে হজ ফরজ এবং কোরবানি ওয়াজিব হিসেবে পালনীয় হবে। কোরবানি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ছাড়াও পরবর্তী দুই দিন, অর্থাৎ ১১ ও ১২ তারিখেও দেওয়া জায়েজ আছে।

হজ মুসলমানদের জন্য চতুর্থ ফরজ হিসেবে অবশ্যপালনীয় ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। শর্ত হচ্ছে আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য থাকতে হবে। পরিবারের নাবালক সন্তান থাকলে, বিবাহযোগ্য কন্যা থাকলে তাদের ভবিষ্যতের বিধিব্যবস্থা করে যেতে হবে। ঋণ থাকলে তা হজে যাওয়ার আগেই পরিশোধ করতে হবে ইত্যাদি। কালেমা, নামাজ, রোজার মতো হজ শর্তহীন অবশ্যপালনীয় নয়। শর্ত সাপেক্ষে আরও একটি ফরজ আছে মুসলমানদের জন্য- জাকাত। জাকাত হচ্ছে সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্দেশে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া। অবশ্যই সে সম্পদ হালাল বা সৎ পন্থায় উপার্জন করতে হবে। সৎ উপার্জনের ওপর ইসলামে খুবই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

কোরবানির তাৎপর্য অসীম। এর ইতিহাস অত্যন্ত গভীর ও শিক্ষণীয়। একদিকে মহান সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিনের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও অটল আনুগত্য, তেমনি আর একদিকে সন্তানের প্রতি আপত্য স্নেহ ও ভালোবাসা। হজরত ইবরাহিম (আ.) এ রকম এক পরীক্ষায় পতিত হলেন যে আল্লাহর নির্দেশ মানলে প্রিয় সন্তান ইসমাইলকে হারাতে হয়, আবার সন্তান স্নেহ অন্ধ হলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারাতে হয়! একদিন হজরত ইবরাহিমকে (আ.) আল্লাহ পাক স্বপ্নে আদেশ করলেন, তাঁকে তার সবচেয়ে প্রিয়বস্তুকে প্রভুর নামে কোরবানি দিতে হবে। হজরত ইবরাহিম বুঝতে পারলেন এই প্রিয় বস্তু আর কিছুই নয়, এ তাঁর জানের টুকরো, নয়ণের মণি ইসমাইল। কী কঠিন পরীক্ষা! কিন্তু সব মুশকিল আসান করে দিলেন স্বয়ং ইসমাইল (আ.)। হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে পাওয়া আল্লাহর পরীক্ষার কথা দ্বিধা থরথর মনে ইসমাইল (আ.)-কে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে কালবিলম্ব না করে পিতাকে আল্লাহর আদেশ পালনের অনুমতি দিয়ে অবিলম্বে তা বাস্তবায়নে পিতাকে অনুরোধ জানালেন।

হজরত ইবরাহিম (আ.) সন্তানের সানন্দচিত্ত অনুমতি পেয়ে নির্ভার মনে আল্লাহর উদ্দেশে পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করতে নিয়ে গেলেন জনমানবশূন্য মিনা প্রান্তরে। ওই সময় হজরত ইবরাহিমকে আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্য থেকে বিচ্যুত করার লক্ষ্যে শয়তান তাঁর হৃদয়ে এমন প্রবল সন্তানবাৎসল্য জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে, যাতে তিনি আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করেন। কিন্তু যাঁর হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আনুগত্য পার্থিব সবকিছুর ঊর্ধ্বে এতই গভীর, তাকে তাঁর লক্ষ্য থেকে সরায় কে! শয়তানের সব কারসাজি ব্যর্থ হয়। হজরত ইবরাহিম নিজের চোখ বেঁধে সন্তানকে কোরবানি করতে উদ্যত হন। ঠিক সে সময় তিনি ফেরেশতার মাধ্যমে জানতে পারেন আল্লাহ পাক তাঁর কোরবানির নিয়ত কবুল করে নিয়েছেন এবং পুত্রের স্থলে একটি চতুষ্পদ পশু কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এভাবেই কোরবানির প্রথা চালু হয় এবং কুপ্ররোচনাদানকারী শয়তান বিতাড়িত করার লক্ষ্যে তিনটি স্থানে পাথর নিক্ষেপ করেন। সেই থেকে ওই স্থানে শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ চালু হয়। তবে এ কথা সকল মুমিন মুসলমান বিশ্বাস করে যে, মানুষ হজের সব শর্ত পূরণ করেও হজ করতে পারে না, আল্লাহ পাক তার নিয়ত কবুল না করা পর্যন্ত এবং সে কারণেই হজ পালনকারীদের বারবার আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে বলা হয়েছে। আর কোরবানির ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ এবং সন্তুষ্টি বিধানের কথাই বলা হয়েছে। কোরবানি করার ক্ষেত্রে লোক দেখানো, অহমিকা প্রকাশ বা অর্থবিত্তের অহমিকা প্রকাশের মধ্যে কোরবানির তাৎপর্য অর্থহীন। হালাল রুজিতে হজ পালন করা এবং কোরবানি দেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কাউকে বঞ্চিত করে কারো মাথায় বাড়ি দিয়ে, কারো হক মেরে, অবৈধ পথে অর্জিত অর্থে যত টাকা খরচ করেই হজব্রত পালন করা এবং কোরবানি দেওয়া হোক না কেন- আল্লাহর কাছে তা কবুল হবে না। কোরবানির মাংসও সমান তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রেখে এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এবং আরেক ভাগ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। কোনোভাবেই এর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না।

মনে রাখা দরকার, সবাইকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও সবকিছু যিনি জানেন, সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হবে না। আল্লাহ পাক স্বয়ং কোরবানি ভোগ না করলেও মানুষের আনুগত্য ও ত্যাগের চেতনা খুব পছন্দ করেন। তাইতো যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য রেখে হালাল উপার্জন দিয়ে কোরবানি দেয়, তাদের কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহ পাক তা কবুল করে নেন।

কোরবানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা ত্যাগ। এই ত্যাগ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উদ্দেশে এবং আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জনের পথ হচ্ছে তাঁর বান্দাদের প্রতি ভালোবাসা, দরদ ও সহমর্মিতা দেখানো। আর্তের সেবা করা, অসহায়কে সাহায্য করা। যারা ইমানদার, পরহেজগার মানুষ, তারা শুধু ইসলামের পাঁচটি ফরজই মান্য করে চলেন না, তারা মানুষের প্রতি স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসা-সমবেদনা নিয়ে তাদের সাহায্য করার জন্য সদাসর্বদা নিবেদিত থাকেন। কেননা সবকিছু মেনে চলার পর গরিব-দুঃখী, দুর্যোগে পতিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হবে না। আর আল্লাহর অনুকম্পা প্রাপ্তি ব্যতীত কোনো মানুষ জীবনে সফল ও সার্থক হবে না।

কোরবানির গূঢ় অর্থ অনুসরণ করতে পারলে মানুষের জন্য সামাজিক জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুধাবন করাও সহজ হয়। আর সামাজিক জীবনে একজন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যের শিক্ষাও আমরা কোরবানির চেতনা এবং আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা থেকে নিতে পারি। সকলের জন্য সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে- ইসলাম ধর্মের খুব বড় একটা শিক্ষা। এই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে না পারলে কারো জীবনে ইহকাল ও পরকালের মুক্তি আসবে না। এই শিক্ষার অর্থ আপনার চারপাশের মানুষকে জানা। তাদের বিপদে সাহায্য করা। অসহায়দের ভালোবাসা। ইসলামের সব শিক্ষা, বিশেষ করে কোরবানির যে ত্যাগের শিক্ষা, সেটাই মানুষকে অনুধাবন করতে বলা হয়। আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার, শয়তান সর্বক্ষণ আমাদের বিপথগামী করতে তৎপর। এই শয়তানকে পরাভ‚ত করার একমাত্র পথ ইসলামের শিক্ষায় দৃঢ় থাকা।

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এই প্রবাসে মুসলমানদের ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গেছে প্রস্তুতি। বিভিন্ন গ্রোসারিতে দেওয়া হচ্ছে কোরবানির অর্ডার। অনেকে দেশেও কোরবানি দিচ্ছেন। কেনাকাটাও চলছে ঈদকে আরও বেশি উৎসবমুখর করে তুলতে। হজ ও কোরবানিকে সামনে রেখে আমরা যেন নতুন করে আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম হই। একটি কথা : দেশের মানুষ এখন ডেঙ্গু এবং বন্যায় বিপর্যস্ত, অসহায়। আমরা যে যেখানে, যে অবস্থায় থাকি, দুর্গত এবং অসহায় মানুষের পাশে যেন দাঁড়াই।
ঈদুল আজহা সবার জীবনে সার্থক হোক। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঠিকানার সকল পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, লেখক, শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদুল আজহা মোবারক।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..