• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন

উচ্চ শুল্কে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৯
  • ২০ বার পঠিত

উচ্চ শুল্কে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা

আমদানি পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক-করের কারণে এ দেশের ভোক্তাকে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশি ভোক্তাকে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ হিসাব ভোগ্যপণ্যের বিবেচনায়। এর মধ্যে অটোমোবাইল ও ক্ষতিকর দ্রব্যের শুল্ককর অন্তর্ভুক্ত নেই। প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ট্যারিফ হার অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার বাদবাকি দেশগুলোর বিবেচনায় বাংলাদেশেরই ট্যারিফ হার সবচেয়ে বেশি। এসব দেশে আমদানিতে ট্যারিফ হার গড়ে ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা দ্বিগুণেরও বেশি, ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আর কেবল ভোগ্যপণ্যের হিসাব করলে তা ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের ট্যারিফ কাঠামো নিয়ে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। আমদানি পণ্যের শুল্ক হার নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টম হাউজগুলোতে অনলাইন শুল্ক পরিমাপ পদ্ধতি এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড থেকে সংগৃহীত পরিসংখ্যান ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উত্পাদন হওয়া সমজাতীয় পণ্য আমদানি নিরুত্সাহিত করতে সরকার অনেক সময় শুল্ক-কর আরোপ করে থাকে। মূলত স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়। এছাড়া উচ্চাভিলাষী ও ক্ষতিকর পণ্য আমদানি কমাতে সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এর ফলে সরকারও বাড়তি রাজস্ব পায়। তবে বাংলাদেশে এ হার প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী অন্যান্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় ভোক্তার পকেট কাটা যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন—স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা তথা শিল্পোদ্যোক্তা বিকাশের স্বার্থে সরকার বাড়তি এ শুল্ক আরোপ করলেও এ সুবিধা প্রকৃত অর্থে কারা পাচ্ছে, সরকারি সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে যথাযথ মূল্যায়ন নেই। এ নিয়ে আমদানিকারকরা আলোচনা-সমালোচনা কিংবা হতাশাও প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা আমদানি পণ্যে ট্যারিফ হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিরক্ষণের নামে যে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা জিডিপির ৫ শতাংশের ওপরে। এই বাড়তি অর্থ যায় ভোক্তার পকেট থেকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। পৃথিবীর অন্যান্য মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় ট্যারিফ ৮ শতাংশ আর আমাদের ২৬ শতাংশ। ভোক্তাকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য ও সেবা দিতে হলে এ উচ্চহারের ট্যারিফ কমিয়ে আনতে হবে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও একাধিক বক্তব্যে ডব্লিওটিওর নীতিমালার কারণে প্রতিরক্ষণ দেওয়াল কমিয়ে আনতে শুল্ক হার ধীরে ধীরে কমানো হবে বলে জানিয়েছিলেন। যদিও বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে সাধারণ শুল্ক রয়েছে, যেটি কাস্টমস ডিউটি নামে পরিচিত। এই হার ১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এর বাইরে তিন শতাংশ হারে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক রয়েছে। এছাড়া রয়েছে সম্পূরক শুল্ক। বর্তমানে দেশে সম্পূরক শুল্ক রয়েছে পণ্য ভেদে ১০ শতাংশ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত। চলতি অর্থবছর থেকে বেশকিছু পণ্যে অ্যাডভান্স ট্যাক্স (এটি) নামে নতুন কর কর্তন করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) নীতিমালা অনুযায়ী ধীরে ধীরে আমদানি পর্যায়ে ট্যারিফের হার কমিয়ে আনতে হবে। ডব্লিওটিওর সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও এই নীতিমালা মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে গত প্রায় দুই দশকের আমদানি পর্যায়ের ট্যারিফ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাস্টমস ডিউটি কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও অন্যান্য শুল্ক হার (প্যারা-ট্যারিফ) বাড়ছে।

পিআরআইর হিসাব অনুযায়ী, বর্ধিত ট্যারিফ কাঠামোর কারণে বছর বছর ভোক্তার ব্যয় বাড়ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ভোক্তার ব্যয় ১ হাজার ২৭৭ কোটি ডলার হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪২২ কোটি ডলার।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা, উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ ও রাজস্ব—মূলত এ তিন উদ্দেশে আমদানি পণ্যে ট্যারিফ আরোপ হয়। এই শুল্কহার কমিয়ে আনা হলে একদিকে রাজস্বে চাপ পড়বে, অন্যদিকে উদ্যোক্তা তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে বলে সরকার মনে করে। সুতরাং বিষয়টিকে কেবল ভোক্তার দিক থেকে দেখার সুযোগ নেই। স্থানীয় শিল্পের বিকাশের স্বার্থে ভোক্তার ওপর এই চাপ দিয়ে থাকে সরকার। তবে এর মাধ্যমে প্রকৃত শিল্পায়ন হচ্ছে কি না তার যথাযথ মূল্যায়ন কিংবা তথ্য সরকারের কাছে নেই। আবার মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থেও ট্যারিফ হারে পরিবর্তন আনা হয়। এর ভার সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ে। তিনি বলেন, যে কোনো প্রতিরক্ষণ গবেষণার মাধ্যমে যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতার বিবেচনায় দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ট্যারিফ কমিশনের সহযোগিতা নেওয়া উচিত। কী উদ্দেশে, এর আর্থিক মূল্য কত, কত সময়ের জন্য—তা জানানো হয় না। অন্যদিকে উদ্দেশ সফল হলো কি না তাও মূল্যায়ন করে প্রকাশ করা দরকার। অন্যথায় কিছু গোষ্ঠী সুবিধা পাবে, ভোক্তা পর্যায়ে চাপ বাড়বে এবং সরকারের উদ্দেশ পূরণ হবে না।

উচ্চ হারে ট্যারিফ পরিশোধ করতে হয়—এ তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে এয়ার কুলার, কোমলপানীয়, গৃহে ব্যবহূত প্লাস্টিকের দ্রব্য, সিরামিকের তৈজসপত্র। এছাড়া কসমেটিক্স, শ্যাম্পু বা এ জাতীয় পণ্য, রুটি, বিস্কুট, পটেটো চিপসসহ কনফেশনারি পণ্য, বৈদ্যুতিক বাতি, জুতা, গ্লাস ও গ্লাসসামগ্রী, বিভিন্ন ধরনের শিট, টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, সব ধরনের পোশাক, স্যানিটারি টাওয়েল, পাট ও টেক্সটাইলের তৈরি কার্পেট ও এ জাতীয় পণ্য, সিরামিকের তৈরি স্যানিটারি দ্রব্য, সিমেন্ট, সাবান ও টয়লেট্রিজও রয়েছে এ তালিকায়। এসব পণ্যে ট্যারিফ হার ৫৪ শতাংশ থেকে ১৫৬ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাত্ কোনো পণ্যের দর যদি রপ্তানিকারক দেশে ১০০ টাকা হয়, আর সেটির ওপর যদি ১৫৬ শতাংশ ট্যারিফ হার থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ভোক্তাকে ঐ পণ্য ২৫৬ টাকায় ক্রয় করতে হয়।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..