• রবিবার, ২৫ অগাস্ট ২০১৯, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন

উন্নয়নের নায়ক ফজলে হাসান আবেদ-এম,এ,কাশেম,পাপ্পু

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ আগস্ট, ২০১৯
  • ৬৭ বার পঠিত

বাংলারজমিন২৪/অনলাইন প্রতিনিধি-

সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোর তত্পরতার কারণে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে সন্দেহ নেই। সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রেজিস্ট্রি অফিস, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ ইত্যাদি। এনজিও সংস্থাগুলোও তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক বিস্তৃত হয়েছে। তার পরও কিছুদিন আগ পর্যন্ত দেশের দুর্গম চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলো সরকারি-বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই ছিল অবহেলিত। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই এ দেশে বাড়তে থাকে এনজিও তত্পরতা। প্রথম দিককার এনজিও বা বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো গ্রাম উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, পুষ্টি উন্নয়ন, পারিবারিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বেশি কাজ করেছে। সদ্য স্বাধীন দেশে সেটিই অনেক বেশি জরুরি ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও এ দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে সরকারি পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। একেক সরকার এসে একেকভাবে দেশ গোছানোর চেষ্টা করেছে। শুরুর দিকে যে মানুষগুলো সরকারের পাশাপাশি উন্নয়নের এক গভীর চিন্তা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়াসী হন তাঁদের অন্যতম ফজলে হাসান আবেদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাকের পাশাপাশি একই সঙ্গে উল্লেখ করা যায় শুরুর দিকের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য, কাজী ফারুক আহমেদের প্রশিকা, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের নাম। এই মানুষগুলো তাঁদের স্বপ্নের সংগঠন নিয়ে নিজস্ব চেষ্টায় উন্নয়নের কাজগুলো এগিয়ে নিয়েছেন।

বাংলাদেশে গত শতকের মধ্য-সত্তর দশকে আমার বয়সী লোকেরা এই মানুষগুলোকে তেমনভাবে না চিনলেও আমি তাঁদের চিনতাম। আমার মতো যাঁরা পল্লীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করেছেন তাঁরাও এঁদের চিনতেন। আমি সে সময় থেকেই বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে কাজ করি। গ্রামে কাজ করতে গেলেই একদম প্রত্যন্ত পল্লীতে হঠাৎ অন্য ধরনের ভবনকাঠামো দেখে উন্নয়নের আভাস পেয়েছি। চারদিকে খড়ের ছাউনি মাটির ঘর, দু-একটি টিনের চালা বাঁশের বেড়ার ঘর, তার মধ্যে একটি পাকা ভবন। কাছে গিয়ে দেখেছি সেটা প্রশিকা, গ্রামীণ বা ব্র্যাকের। উপলব্ধি করেছি এসব উন্নয়নেরই এক ভিন্ন রকম সূচনা। আশির দশকের শেষের দিকের কথা। কুমিল্লার তৃণমূল পর্যায়ের এক খেটে খাওয়া মানুষ মোহাম্মদ ইয়াসিন এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ফিলিপাইনের র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পেলেন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে উন্নয়ন সংস্থার বেশ কিছু কর্মীকে পেয়েছিলাম। বেসরকারি পর্যায়ে বানানো একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখলাম। প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হচ্ছে, কিভাবে কুমিল্লার ইয়াসিনের ‘দিদার বহুমুখী সমবায় সমিতি’ গড়ে উঠল। স্থানীয় ১০ জন দরিদ্র মানুষ এক আনা এক আনা করে জমা দিয়ে ১০ আনায় গড়ে তুলল একটি সমবায় সংগঠন। সেটি পরবর্তীকালে বিশাল এক সংগঠনে রূপ নেয়।

দিনে দিনে আমারও কাজের পরিধি বেড়েছে। উন্নয়ন সংগঠনগুলোও অনেক বেশি বিস্তৃতি লাভ করছে। তাদের শক্তি বাড়ছে। সরকারের পাশাপাশি তারাও গ্রাম উন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছে। তাদেরও একটা দক্ষতা তৈরি হচ্ছে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবি এই জন্য যে আমার কাজের ভেতর দিয়েই চোখের সামনে দেশের কয়েকটি উন্নয়ন সংগঠনের ব্যাপক কার্যক্রম দেখার সুযোগ পেয়েছি। এসব কাজের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগসূত্র না থাকলেও আমরা যেন বেড়ে উঠেছি  তাঁর উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী। ক্ষুদ্রঋণ থেকে দিনে দিনে গ্রামীণ স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, কৃষি ইত্যাদি কাজ সম্প্রসারিত হতে থাকে। গ্রামীণ তৃণমূল কৃষক পরিবার অল্পস্বল্প পুঁজি হাতে নিয়ে নব্বইয়ের দশকে বর্গাচাষের যে সুযোগ পায় তার পেছনে ছিল ব্র্যাকের মতো সংগঠনগুলো। গ্রামে গ্রামে আমি দেখেছি কৃষক ভূমিহীন হওয়ার কারণে সরকারি ব্যাংকের ঋণ পায় না। পুঁজি না থাকার কারণে জমিও আবাদ করতে পারে না। মহাজনি ঋণের সুদ দিয়ে পুষিয়ে উঠতে পারে না। তখন এনজিওর ঋণ তার কাজে লেগেছে। চাষির বউ ঋণ এনে দিয়েছে, তার ওপর ভরসা করে সে জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছে। কিছু বিফলতা, ব্যর্থতা বা নেতিবাচক উদাহরণ নেই তা নয়। তবে তৃণমূলে উন্নয়নের চাকা ঘোরানোর ক্ষেত্রে এই কাজগুলো ছিল অনেক কার্যকর। আমি মনে করি, এর পেছনে ফজলে হাসান আবেদের মতো মানুষের দীর্ঘ এক মিশন ও ভিশন কাজ করেছে।

ফজলে হাসান আবেদ হবিগঞ্জের ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে, বহুজাতিক কম্পানির বড় পদমর্যাদা আর বেতনের চাকরি ছেড়ে অভাবগ্রস্ত ও দুর্গত মাতৃভূমিতে ফিরে এসে উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছেন। যত দূর জানি, ফজলে হাসান আবেদের উন্নয়ন অভিযান শুরু হয় ১৯৭০ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময়। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়েই তিনি তাঁর স্বপ্নের পরিপূর্ণ নকশাটি এঁকে ফেলেন। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশে সিলেটের শাল্লায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাসরত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই তিনি জন্ম দেন ব্র্যাকের। শুরুতে সংগঠনটি ছিল ত্রাণ ও পুনর্বাসনকেন্দ্রিক, পরে ১৯৭৩ সালে এসে এটি সার্বিক গ্রাম উন্নয়নমুখী একটি সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কবি বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন ব্র্যাকের প্রথম চেয়ারপারসন। এতে আরেকটি জিনিস বোঝা যায়, তা হলো ব্র্যাকের গড়ে ওঠার সঙ্গে ।

 

বিভিন্ন সময় আমার নিজের কাজ করতে গিয়েও ফজলে হাসান আবেদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে দিনে দিনে বিস্তর জানা হয়েছে। দেশ-বিদেশে ব্র্যাকে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয় তাঁর সম্পর্কে। তাঁদের কাছ থেকে জেনেছি ফজলে হাসান আবেদের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক। ফজলে হাসান আবেদ তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের কল্যাণমুখী কাজ ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ব্র্যাক’ কালক্রমে এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকায় ছড়িয়ে গেছে ‘ব্র্যাক’।

ব্র্যাক বাংলাদেশভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংগঠন হলেও আফ্রিকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অগ্রগতির সঙ্গে মিশে গেছে গভীরভাবে। এখন সেখানে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্র্যাককে ধরা হয় সবচেয়ে কার্যকর ও গতিশীল উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে। আমি উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কৃষি প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান, বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের বহু কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই ব্র্যাকের উন্নয়ন তত্পরতার প্রশংসা করেছেন। আমি দেখেছি ফজলে হাসান আবেদের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া উন্নয়নচিন্তা এখন পৃথিবীর অনেক মানুষকেই প্রভাবিত ও আলোড়িত করছে।

যা হোক, উন্নয়নমনস্ক মানুষগুলো কাজে ও ভাবনায় অনেক বেশি প্রশস্ত ও ব্যাপক। ফজলে হাসান আবেদ তাঁর সুদীর্ঘ কর্মবহুল জীবনে এ দেশের জন্য অনেক বড় সম্মান বয়ে এনেছেন। ব্রিটিশ সরকারের নাইটহুড, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ, গেটস ফাউন্ডেশনের বিশ্ব স্বাস্থ্য পুরস্কারসহ অনেক বড় বড় পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। তাঁর হাতে গড়া সংগঠন ‘ব্র্যাক’ পৃথিবীর বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের মর্যাদা নিয়ে ব্যাপক উদ্যমে কাজ করে চলেছে। সব মিলিয়ে তাঁর বিরামহীন কর্মসাধনা এ দেশের জন্য আরো বড় মর্যাদা ও সম্মান বয়ে আনবে—এই বিশ্বাস করি।

লেখক : প্রধান সম্পাদক: এম,এ, কাশেম পাপ্পু/বাংলারজমিন২৪কম

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..