• রবিবার, ২৫ অগাস্ট ২০১৯, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন

পর্নো আসক্তি যৌন অক্ষমতার কারণ হতে পারে?

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৯
  • ৮৮ বার পঠিত

বর্তমানে প্রতি তিন জন তরুণের মধ্যে একজনের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (ইডি) বা লিঙ্গ উত্থানগত সমস্যা আছে। পর্নো আসক্তি থেকে মুক্তিলাভ করলে কি তরুণদের এ সমস্যা সমাধান হতে পারে?



পর্নো তারকারা সামাজিক মাধ্যমে সরব। প্রতীকী ছবিটি সংগৃহীত
বাংলারজমিন২৪/অনলাইন বর্তমানে প্রতি তিন জন তরুণের মধ্যে একজনের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (ইডি) বা লিঙ্গ উত্থানগত সমস্যা আছে। অনেকের সমস্যা আবার এতটাই প্রকট যে তাদেরকে পুরো লিঙ্গটিই নতুন করে ইমপ্ল্যান্ট করাতে হচ্ছে। পর্নো আসক্তি থেকে মুক্তিলাভ করলে কি তরুণদের এ সমস্যা সমাধান হতে পারে?সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রা নামে বেশি পরিচিত) ওষুধটি পুরুষের লিঙ্গ উত্থানের কাজে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত মনে করা হয় দুর্বল ও ভগ্ন স্বাস্থ্যের ব্যক্তিরা ভায়াগ্রার প্রধান ক্রেতা। কিন্তু বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪-৩৫ শতাংশ তরুণ ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা ইডি রোগে ভুগছে।

ভালোবাসা, যৌনতা এবং ইন্টারনেট বিষয়ে কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘দ্য রিওয়ার্ড ফাউন্ডেশন’-এর গবেষক ম্যারি শার্প বলেন, ‘২০০২ সাল পর্যন্ত মাত্র ২-৩ শতাংশ ইডি রোগীর বয়স ছিল ৪০-এর নিচে। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে যখন হাই ডেফিনেশন ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি খুব সহজলভ্য হতে শুরু করল, তারপর থেকে তরুণ ইডি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলছে।’

হাই ডেফিনেশন ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি খুব সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ ইডি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলছে। ছবি: সংগৃহীত

এখন পর্যন্ত দুর্বল স্বাস্থ্য, অতিরিক্ত ওজন, মাদক-তামাক-অ্যালকোহলে আসক্তি, বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, অবসাদ এবং বিষাদগ্রস্ততাকেই ইডি রোগের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু পর্নোগ্রাফি এ রোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে বলে বেশ কয়েক বছর ধরেই জোরেশোরে আলোচনা চলছে। গবেষণার ফলাফলও বিভক্ত। কোনো কোনো গবেষণায় বলা হয়েছে, পর্নোগ্রাফির সঙ্গে ইডির কোনো সম্পর্কই নেই।

লন্ডনভিত্তিক সাইকোসেক্সচ্যুয়াল এবং রিলেশনশিপ থেরাপিস্ট ক্লেয়ার ফকনার বলেন, ‘২০-২২ বছর বয়সী ইডি রোগীও পাচ্ছি আমি। পর্নোগ্রাফির একটা সমস্যা হচ্ছে, এটি একটি বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা। এটা আবার কিছু মিথও তৈরি করে রেখেছে। যেমন—সব পুরুষের যৌনাঙ্গ একদম শক্ত এবং নারীরা সবসময়ই মিলনের জন্য প্রস্তুত থাকে।’

যারা পর্নোগ্রাফি দেখে অভ্যস্ত, যৌনতার অর্থ তাদের কাছে ভিন্ন। তাদের ভাবনা অনেক সময়ই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এ ধরনের কেউ যখন বাস্তবে যৌনক্রিয়ায় মিলিত হতে যায়, তখন তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও আপদগ্রস্ততা কাজ করে। এমন অবস্থায় তাদের যৌনাঙ্গ যথাযথভাবে উত্থিত হয় না।

বহু অনলাইন ফোরামে অনেকেই পর্নো আসক্তি থেকে মুক্তির সংগ্রাম, এর ফলে সৃষ্ট মানসিক বৈকল্য এবং কীভাবে তারা হালকা পর্নোগ্রাফি দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে হার্ডকোর পর্নোগ্রাফির দিকে আসক্ত হয়ে গেছেন, পর্নো আসক্তি কীভাবে তাদের যৌন জীবনে প্রভাব ফেলেছে—সেসব অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন। যদিও এটা সরাসরি বলার সুযোগ নেই যে পর্নো আসক্তির সঙ্গে ইডির সম্পর্ক আছে, কিন্তু এত মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বোঝা যায় যে, জীবন থেকে পর্নো আসক্তি যদি দূর করা যায়, তাহলে বাস্তব জীবনের যৌনতা আরও সুখকর হতেও পারে।

যারা পর্নোগ্রাফি দেখে অভ্যস্ত, যৌনতার অর্থ তাদের কাছে ভিন্ন। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে তাদের মানসিক ও শারীরিক ফারাক হয়ে যায় যোজন। ছবি: সংগৃীহত

পর্নোগ্রাফি এবং হস্তমৈথুনে আসক্তদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আলেক্সেন্ডার রোডস ‘নোফ্যাপ’ (নো মাস্টারবেশন) নামের একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী রোডস ১১-১২ বছর বয়স থেকে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখা শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাই স্পিড ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির সঙ্গে বেড়ে ওঠা প্রথম প্রজন্মের মানুষ আমি।’

রোডস মনে করেন, বর্তমানে বহু তরুণ হস্তমৈথুন এবং পর্নোগ্রাফিকে সমার্থক ভাবা শুরু করেছেন। নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব তারা অনুভব করছেন না।

সম্প্রতি এক আলোচনায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন রোডস। তিনি বলেন, ‘১৯ বছর বয়স থেকে আমি যৌন মিলন শুরু করি। পর্নোগ্রাফিক ভিডিও অনুভব করা ছাড়া আমি উত্তেজিত হতে পারতাম না। ইন্টারনেট পর্নো ছিল আমার যৌন শিক্ষা।’

রোডস যে বয়সে ইন্টারনেটে পর্নো দেখা শুরু করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কিছু নয়। ২০১৬-১৭ সালে যুক্তরাজ্যের মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১১-১৬ বছর বয়সী ৪৮ শতাংশ শিশু ইন্টারনেটে পর্নো দেখেছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশই তাদের বয়স ১৪ হওয়ার আগেই ইন্টারনেটে পর্নো উপভোগ করেছে।

৬০ শতাংশ শিশু প্রথম পর্নো দেখেছে নিজেদের বাড়িতে। আয়ারল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ ছেলে তাদের বয়স ১৩ হওয়ার আগেই হস্তমৈথুনের জন্য পর্নোগ্রাফি উপভোগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। পর্নো তারকারা সামাজিক মাধ্যমে সরব। তারা তাদের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নিয়মিত তাদের কাজের হালনাগাদ তথ্য জানান। পর্নো তারকাদের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্ট থেকে একটি বা দুটি ক্লিকের মাধ্যমেই যে কেউ হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখতে পারছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিকমাধ্যম এখন শিশুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। তাই এ ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি কনটেন্ট দেখার ঝুঁকিও বেশি।

ম্যারি শার্প বলেন, ‘তার প্রতিষ্ঠান পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু পর্নোগ্রাফির অতিরিক্ত সহজলভ্যতা শিশুদের যৌন অনুভূতি পাল্টে দিচ্ছে এবং এটি তাদের এমন বয়সে হচ্ছে, যখন তারা মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। বেশির ভাগ আসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা শুরু হয় বয়ঃসন্ধিকালে। তাই এ সময়টা সবার জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

ম্যারি এবং ফকনার উভয়ই মনে করেন, পর্নোগ্রাফির অতিরিক্ত উত্থান ও সহজলভ্যতা থেকে সামান্য হলেও বোঝা যায়, এখনকার প্রজন্ম কেন তাদের আগের প্রজন্মগুলোর চেয়ে যৌনতায় কম আগ্রহী।

পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা শিশুদের যৌন অনুভূতি পাল্টে দিচ্ছে। অরক্ষিত করছে মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে। ছবি: সংগৃহীত

পর্নো আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য গেব ডিম ‘রিবুট ন্যাশন’ নামের একটি প্লাটফর্ম চালু করেছেন। নিজের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স যখন ২৩, তখন আমি এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে যৌন মিলনের চেষ্টা করেছিলাম। মেয়েটিকে আমি খুব পছন্দ করতাম এবং তার জন্য আকর্ষণ অনুভব করতাম। কিন্তু তার সঙ্গে যৌনতায় গিয়ে দেখলাম আমি কোনো উত্তেজনাই অনুভব করছি না। আমার যৌনাঙ্গ সামান্যতমও উত্থিত হলো না।’

ফকনার বলেন, ‘যৌনতাড়িত হতে অনেকেরই উচ্চ ডোজের ওষুধ নিতে হয়। একই ধরনের উত্তেজনার জন্য প্রতিবারই তার আগের বারের চেয়ে বেশি ডোজের ওষুধ নিতে হয়। এটা ভয়ঙ্কর। আমার অনেক রোগী আমাকে বলেছে যে তারা যেসব পর্নোগ্রাফি দেখছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট নয়।’

ফকনারের কথার সূত্র ধরে ম্যারি শার্পও বলেন, সব ধরনের আসক্তির বেলাতেই এটি সত্য।

পর্নোগ্রাফির সঙ্গে ইডির যোগসূত্র এখনো অনেকেই অস্বীকার করেন। কিন্তু ম্যারি শার্প জানান, এটি কারো কারো বেলায় সত্যি। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ক্লিনিক, সেক্স থেরাপিস্ট ও ডাক্তারদের কাছ থেকে আমরা যা শুনতে পাচ্ছি, তা হচ্ছে এ ধরনের ৮০ ভাগ সমস্যাই পর্নোগ্রাফির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দ্য রিওয়ার্ড ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্যজুড়ে অনেকগুলো কর্মশালার আয়োজন করেছে। এসব কর্মশালায় প্রতিষ্ঠানটি জানতে পেরেছে ডাক্তাররা সাধারণত এ ধরনের রোগীদের তাদের পর্নো আসক্তির কথা জিজ্ঞেসই করেন না। তারা অধিকাংশ সময়ই তাদেরকে সরাসরি ভায়াগ্রা দিয়ে দেন। কিন্তু অনেকের শরীরেই ভায়াগ্রা কাজ করে না।’

ম্যারি শার্প পুরো চিত্রটিকে বড় সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

বাংলারজমিন২৪/অনলাইন

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..