• বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন

ইউরোপের ইতিহাস, আধুনিক বিশ্ব এবং মুসলমানদের উপর তার প্রভাব

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৯
  • ৪২৪

বাংলারজমিন২৪/অনলাইন প্রতিনিধি– ইউরোপের ইতিহাস, আধুনিক বিশ্ব এবং মুসলমানদের উপর তার প্রভাব (১ম পর্ব) –

আমি আলোচনা শুরু করতে চাই ইউরোপের ইতিহাস নিয়ে, ইনশাল্লাহ। ইউরোপের কিছু ইতিহাস নিয়ে। আমাদের সময়ের সমস্যাগুলো উপলব্ধি করার জন্য এই প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। আমি আপনাদের সে সময়ের ইউরোপে নিয়ে যাচ্ছি যখন চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিলো। আপনারা যদি এটা না জেনে থাকেন ….তার সারমর্ম হলো – তখনকার ইউরোপ ছিল একটি ধর্মীয় সমাজ, আর সমাজের উপর চার্চের ছিল ব্যাপক কর্তৃত্ব। সে সময়ের চার্চ নিষ্ঠুর নিপীড়নমূলক নীতি গ্রহণ করেছিল। পোপের কথাকে সৃষ্টিকর্তার কথার সমমূল্য দেয়া হতো।

কেউ পোপের কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করলে, তাকে আমাদের ভাষায় মুরতাদ ঘোষণা করা হতো। ধর্ম থেকে তাকে বের করে দেয়া হতো এবং হত্যা করা হতো। তাদের মতে, চার্চের সাথে দ্বিমত পোষণের একমাত্র ক্ষতিপূরণ রক্তের মাধ্যমে দিতে হবে। তাকে প্রথমে নির্যাতন করা হতো তারপর হত্যা করা হতো। শুধু হত্যা নয়, প্রথমে নির্মম অত্যাচার এরপর হত্যা। তারা মনে করতো তার আত্মাকে রক্ষা করার এটাই একমাত্র উপায়।

ইউপরোপ এই ধরণের ধর্মীয় মতবাদ দ্বারা দীর্ঘকাল শাসিত হয়ে আসছিলো। এর ফলে দুইটি মতবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। উভয়টি প্রায় একই সময় আত্মপ্রকাশ করে। তার একটি হলো – প্রোটেস্ট্যান্ট রেফরমেশন। চার্চের মতে, সাধারণ মানুষের বাইবেল পড়ার কোনো অধিকার নেই। তারা নিজে নিজে বাইবেল পড়তে পারবে না। চার্চের অথরিটি বা পোপের নিয়োগপ্রাপ্তরাই কেবল বাইবেল পড়তে পারবে এবং এর ব্যাখ্যাও তারাই করবে। তাদের ব্যাখ্যার বিপরীতে কোনো ভিন্নমত পোষণ করা যাবে না।

প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন এসে ঘোষণা দিলো – না, প্রত্যেক খ্রিস্টানের বাইবেল পড়ার অধিকার থাকতে হবে। নিজেদের জন্য পড়বে, নিজেরা নিজেদের জন্য এর থেকে অর্থ খুঁজে নিবে। এর জন্য আমাদের চার্চের দরকার নেই। এভাবে চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলো। সংক্ষেপে এটাই প্রোটেস্ট্যান্ট মুভমেন্ট, এই ব্যাখ্যাকে বলা যেতে পারে ক্লাস সেভেন এইট এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উপযোগী ব্যাখ্যা।

সে সময় আরেকটি মুভমেন্টেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই আন্দোলনটি ছিল আরো শক্তিশালী। আর দু’টি আন্দোলন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। দ্বিতীয় আন্দোলনকারীরা বলতে লাগলো – “চার্চ এতো দিন ধরে যে মতবাদ প্রচার করে আসছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে তা যৌক্তিক নয়। চার্চের এই মানুষগুলো দর্শনের বই পুড়েছে, বিজ্ঞানের বই পুড়েছে, যা কিছুই তাদের মতবাদের সাথে মিল রাখে না ….যেমন, বাইবেলের মতে, পৃথিবী হলো মহাবিশ্বের কেন্দ্র…কিভাবে আমরা এটা মেনে নিবো? যেখানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই মতের সাথে সাংঘর্ষিক। আমরা এই বিশ্বাস মেনে নিতে পারি না।”

এর ফলে চার্চ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে ‘কুফর’ বা ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে ঘোষণা করলো। তাই তারা লাইব্রেরির পর লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলেছিলো, বৈজ্ঞানিকদের হত্যা করেছিল, দার্শনিকদের মেরে ফেলেছিলো। যে বিষয়গুলো ফরাসি বিপ্লবে প্রেরণা জুগিয়েছিল….খ্রিস্টান মতবাদের দুইটি দিক প্রথমত: এটা নিপীড়নমূলক আর দ্বিতীয়ত: এটা অযৌক্তিক। আমাদের এমন মতবাদের নিকট আসতে হবে যা যৌক্তিক আর তা হলো – বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তি এবং বিচারবুদ্ধি। এভাবে দুই দিক থেকে চার্চ বিদ্রোহের স্বীকার হয়, ধর্মীয় দিক থেকে প্রোটেস্ট্যান মুভমেন্টের দ্বারা এবং বৈজ্ঞানিক দিক থেকে, সেকুলার আন্দোলন দ্বারা। যা চার্চের কর্তৃত্বকে দূর করে দেয়।

ইউরোপ জুড়ে যখন এই বৈপ্লবিক আন্দোলন চলছিল, আর এই আন্দোলন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী এক আন্দোলন। যখন এই বিপ্লব ঘটে গেলো। হঠাৎ করেই ইউরোপ একটি মুক্ত চিন্তার সমাজে পরিণত হলো। তারা নতুন করে আবিষ্কর করতে লাগলো কোন কোন বিশ্বাস তাদের ধরে রাখা উচিত, আর কোন কোন ধারণা-চিন্তা সমাজের কেন্দ্রে থাকা উচিত। এটা নব চিন্তা-চেতনার একটি মুক্ত বাজারে পরিণত হয়ে গেলো।

এই সময় কয়েকটি দর্শনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মূলত, প্রথম দিকে সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের অনেকেই ছিলেন নামকরা দার্শনিক। তাদের নিকট দর্শন এবং বিজ্ঞান একসাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। আর ধারণা-চিন্তার এই মুক্ত বাজারে শুধু একটি নয় অনেকগুলো দর্শন একে অন্যের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। কিন্তু, আমি চাই আপনারা এই বিষয়টা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন…একটি কমন চিন্তা অন্য সব চিন্তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, যদিও এই চিন্তার ছোট-খাটো ভিন্ন পাঠও পরিলক্ষিত হয়, তবু বলা চলে একটি চিন্তা শেষ পর্যন্ত বর্তমান থেকে যায়। আর এটি শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এই চিন্তাটি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

আজ আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি তা আসলে সেই মতবাদ বা সেই ধারণাগুলোর প্রতিক্রিয়ার ফল। তাই আমি প্রথমে সে ধারণাগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে চাই, তারপর সূরাতুল ক্বিয়ামাহ থেকে কিছু উপস্থাপন করবো। সূরা ক্বিয়ামার প্রথম দিকের কয়েকটি আয়াত, কিন্তু তার পূর্বে দৃশ্যপট তৈরী করে নিতে চাই।

প্রাক আধুনিক যুগের প্রায় সকল সমাজ ব্যাপকভাবে ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। যে কোন ধর্ম দ্বারাই হউক না কেন, হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইসলাম …অধিকাংশ সমাজ কোনো না কোনো একটি ধর্মীয় মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ধর্মীয় সমাজে ধর্ম শিক্ষা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজ্ঞান বা ব্যবসা শিক্ষা নয়। ধর্মীয় নেতা হতে পারা ছিল সবচেয়ে বেশি প্রেস্টিজের। তাই প্রাক আধুনিক যুগে যাজক, পুরোহিত, ঈমাম, আলেম, হিন্দুদের আধ্যাত্মিক গাইড বা যাই হউক না কেন এই মানুষরা ছিলেন সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তারা ছিলেন সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ।

এখন এই মানুষদের কাছ থেকে আপনি কী শিক্ষা গ্রহণ করেন? এদের কাছ থেকে আপনি প্রধানত তিনটি বিষয় শিখেন। তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া শিখেন। আপনি গুরুত্ব দেয়া শেখেন ঈশ্বরের প্রতি, আমি এখনও ইসলাম নিয়ে কথা বলা শুরু করিনি তাই আমি ‘আল্লাহ’ না বলে ঈশ্বর বলছি। বিভিন্ন ধর্মে ঈশ্বরের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। ঈশ্বর দ্বারা কেউ বহুঈশ্বর বুঝতে পারেন বা এক ঈশ্বর বা পৌরাণিক কোনো কাহিনী…যেরকম ধারণাই হউক না কেন মোটকথা প্রতিটি ধর্মে অদৃশ্য ঈশ্বরের একটি ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। আর সেই ঈশ্বরের প্রতি আপনি সর্বপ্রথম গুরুত্ব দেয়া শিখেন।

আর দ্বিতীয়ত, আপনি যে বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া শিখেন তা হলো, আত্মা। মানুষের একটি শরীর রয়েছে আবার তাদের একটি আত্মাও রয়েছে। আপনি সকল ধর্মেই আত্মার উপর গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করবেন। আমাদের ভেতরে রহস্যময় একটা কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে আর এটাকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। তাহলে এখন আমাকে বলুন, প্রথমে কী বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হলো – ঈশ্বর। আর দ্বিতীয়ত – আত্মা।

তৃতীয় বিষয়টি হলো – মৃত্যু পরবর্তী জীবনের একটি ধারণা। পৃথিবীর এই জীবনের পর কিছু একটা ঘটবে। কারো মতে, আপনি একটি গাছ বা পাখি হিসেবে পুনরায় জন্ম লাভ করবেন। অথবা আপনি স্বর্গ বা নরকে যাবেন। মোটকথা, তৃতীয় ধারণাটি হলো, এই পৃথিবীর জীবনই একমাত্র জীবন নয়। এই জীবনের পর আরো জীবন আছে। এই পৃথিবী শেষ কথা নয়, এরপর আরো অস্তিত্ব রয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সকল ধর্ম জুড়ে তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হতো। আপনারা আমাকে বলুন – গড, আত্মা, আর কী? পরকালীন জীবন। এই ধারণাগুলো কি ইসলামের ক্ষেত্রেও দেখা যায়? হ্যাঁ, প্রকৃতপক্ষে, ইসলামেও এই তিনটি ধারণার একটি নিদৃষ্ট রূপকে আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি।

তো, ইউরোপে এই বিপ্লব ঘটে গেলো। তারা বলতে লাগলো, আমরা বহুদিন ধরে ঈশ্বরের উপর গুরুত্বারোপ করে আসছি, আত্মার উপর গুরুত্বারোপ করে আসছি, মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর গুরুত্বারোপ করে আসছি….কিন্তু আমাদের এই দুনিয়াবী জীবনটাতো ভীষণ অপ্রীতিকর। চার্চ দেখো কি করেছে !! আমরা সব সময় গড নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে আসছি। আমরা ভুল বিষয়ের উপর এতদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছিলাম, আমাদের বরং এই মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করা উচিত। ঈশ্বর নিয়ে নয়, বরং এই বস্তুবাদী বিশ্বের প্রতি আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। এখন কেউ যদি আল্লাহ বা গড নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে, তাহলে সে কী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে? তার নিকট চিন্তা করার মত কোন বিষয়টা বাকি থাকবে? বস্তুগত দুনিয়া। তারা বলতে লাগলো, আমাদের সকল শক্তি সামর্থ্য এই বাস্তব দুনিয়া উপলব্ধি করার কাজে ব্যয় করা উচিত।

এই পৃথিবীকে বোঝার জন্য সামান্য যা চেষ্টা করেছি, তার ফলেই আমরা অনেক উপকার লাভ করেছি। আপনি যখন বস্তুগত দুনিয়া বোঝার চেষ্টা করেন – যা মূলত বিজ্ঞান – আপনি নিত্য নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে শুরু করেন। আর আবিষ্কার কী করে? আবিষ্কার দুনিয়াকে আরো উন্নত করে তোলে। নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবিত হতে শুরু করে, বিভিন্ন উপকারী যন্ত্র আবিষ্কৃত হতে শুরু করে। যদি আপনি বস্তুগত দুনিয়া অধ্যয়ন না করেন, আপনার পক্ষে এই আবিষ্কার করা সম্ভব নয়।

তারা বলতে লাগলো, দেখো যারা গড নিয়ে অধ্যয়ন করে তারা কী আবিষ্কার করেছে? আর বিপরীতে যারা এই জগৎ নিয়ে অধ্যয়ন করে দেখো, তারা অবাক করা কত কি আবিষ্কার করে ফেলেছে! দেখো, এখন আমরা কত শত রকমের যন্ত্র বানাতে পারি! স্থাপত্য শিল্পে আমাদের অগ্রগতি দেখো! আর তাই আমাদের সকল শক্তি সামর্থ্য ঈশ্বর বোঝার জন্য ব্যয় না করে এই বস্তুগত দুনিয়া বোঝার কাজে ব্যয় করা উচিত। দ্বিতীয় কোন বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হতো? আপনাদের আবার জিজ্ঞেস করছি, কারণ আমি দেখতে চাই আপনারা জীবিত আছেন কিনা। আত্মার প্রতি।

তারা বলতে লাগলো – আত্মা আবার কী? কেউ কি কখনো এটা দেখেছে? কেউ কি জানে কোথায় এর অবস্থান? আমরা আত্মা নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু পৃথিবীতে যে কত রকমের রোগ বালাই রয়েছে সে ব্যাপারটা কে দেখবে? আমাদের শরীরের পুষ্টির বিষয়টা কে দেখবে? আমাদের এই বাস্তব শরীরের ব্যাপারটা কি দেখতে হবে না? তাই আত্মার অধ্যয়নের উপর গুরুত্বারোপ না করে আমাদের উচিত শরীর বিদ্যা অধ্যয়নের উপর গুরুত্বারোপ করা।

আপনারা গত কয়েক শতাব্দীর দিকে তাকিয়ে দেখুন, গত কয়েক শতকে কি মানুষের শরীর নিয়ে ইতিহাসের সর্বাধিক পরিমান গবেষণা করা হয়নি? হ্যাঁ, অবশ্যই হয়েছে। বস্তুগত জগৎ তথা এই পৃথিবী এবং পৃথিবী ছাড়িয়ে আরো যা কিছু আছে তা নিয়ে কি মানব ইতিহাসের সর্বাধিক পরিমান গবেষণা চালানো হয়নি? হ্যাঁ, অবশ্যই। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গত কয়েক শতকে ঈশ্বরের পরিবর্তে অধ্যয়ন করা হয়েছে এই জগৎ নিয়ে, আর আত্মার পরিবর্তে অধ্যয়ন করা হয়েছে শরীর নিয়ে; বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে।

তো, আগে যেখানে সমাজের সবচেয়ে উঁচু স্তরের মানুষেরা ঈশ্বর এবং আত্মা নিয়ে অধ্যয়ন করতো কিন্তু আজকের দিনে তাদেরকেই সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষিত মনে করা হয় বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে যাদের পি এইচ ডি রয়েছে, অথবা মেডিসিনে যাদের উচ্চ ডিগ্রি রয়েছে। এরাই হলো সর্বোচ্চ শিক্ষিত।

তৃতীয় বিষয়টি কী ছিল? ঈশ্বর, আত্মা আর কি? হ্যাঁ? মৃত্যু পরবর্তী জীবন। স্বর্গের জীবন অতি চমৎকার হবে, এখানে কষ্ট ভোগ করো কিন্তু স্বর্গে গিয়ে তো আরামে থাকবে। এ সম্পর্কে ইউরোপিয়ানরা কী বলে? তারা বলে – “আমরা এ সব শুনতে শুনতে ক্লান্ত। মৃত্যুর পর আরেকটা জীবন আছে কিনা আমি জানি না, কিন্তু আমাদেরকে এই পৃথিবীর জীবনের উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। চলো চেষ্টা করে দেখি যদি আমরা এই পৃথিবীর জীবনটাকে উন্নত করতে পারি কি না। চলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করি, সমাজবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করি, নৃবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করি, গণযোগাযোগ নিয়ে গবেষণা করি….চলো আমাদের জীবনকে উন্নত করার লক্ষ্যে মানবিক জ্ঞানের এই সমস্ত ক্ষেত্রগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা চালাই। যেন আমরা নিজেদের ভালোভাবে শাসন করতে পারি, উন্নত জীবন যাপন করতে পারি।

প্রসঙ্গক্রমে, তারা যতবেশি এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনা লাগলো….যেমন তারা যত বেশি নগর উন্নয়ন নিয়ে পড়তে লাগলো, তারা যত বেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করতে লাগলো, তারা যত বেশি সমাজবিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করতে লাগলো, এমনকি তারা যত বেশি সাইকোলজি নিয়ে পড়তে লাগলো ….এর ফলে ইউরোপে কি কোনো ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে? হ্যাঁ, ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।

চারিদিকে রাস্তাঘাট তৈরী হতে লাগলো, দালান কোঠা নির্মিত হতে লাগলো, ব্যবসার সম্প্রসারণ হতে লাগলো, নিত্য নতুন বিষয় আবিষ্কৃত হতে শুরু করলো, ….প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বে কারা পৃথিবীর নেতৃত্বে ছিল? সবাই কার মতো হতে চাইতো? এটা ছিল ইউরোপ। স্পষ্টত, তারা এই নতুন এই ধারণাগুলো নিজেদের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তারা তাদের লোভী স্বার্থ সিদ্ধির জন্য চেয়েছিলো এই ধারণাগুলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক। আমাদের প্রায় সবার পূর্বপুরুষদের ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের স্বাদ সহ্য করতে হয়েছে। আমাদের অধিকাংশের এই অভিজ্ঞতা সহ্য করতে হয়েছে।

এর মানে কী? এর মানে হলো – আমাদের পূর্বপুরুষদের সরাসরি এক ধরণের ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছিল। বস্তুত, আপনি যদি পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, আলজেরিয়ার মত দেশগুলো বা আজকের দিনের গোটা মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন… এখনো এসব দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষা কারিকুলাম ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স দ্বারা এবং তারা যা রেখে গেছে তার দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত। এখনো সেই প্রভাব বিদ্যমান, এখনো বিদ্যমান। সেই প্রভাব বিদূরিত হয়নি।

আর এই সব কিছুর মাঝে মানুষ যখন প্রশ্ন করতে লাগলো, তাহলে ঈশ্বর, এবং বিশ্বাসের ব্যাপারটা কিভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?

তখন এই যুক্তিগুলো দেখানো হচ্ছিলো…আল্লাহ বলতে কেউ নেই, ধর্ম মানুষের বানানো ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই ইউরোপে কিছু মানুষ তখন নাস্তিকতায় দীক্ষিত হতে শুরু করে। এই বছর আমার সুইজারল্যান্ড ঘুরে আসার একটি সুযোগ হয়েছিল। যেটা খুবই রক্ষণাত্মক একটি সমাজ। তারা তাদের চার পাঁচশো বছরের পুরোনো চার্চগুলো রক্ষা করার ব্যাপারে খুবই সচেতন। কিন্তু কেউ সেই চার্চগুলোতে যায় না। গির্জার বিল্ডিংগুলো সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ তারা ইতিহাস ভালোবাসে কিন্তু ধর্মের সাথে এখন তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আসলে কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি ধর্মে বিশ্বাস করেন? তারা উত্তরে বলে – না, আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না। যদিও তারা এখনো চার্চের ঘন্টা বাজার শব্দ শুনতে পায়। কারণ তারা শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ করতে চায়। তাই এটা এখন শুধু অসার ইতিহাস।

আমি আপনাদের আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। নিউইয়র্ক সিটিতে নির্মিত অন্যতম পুরোনো একটি গির্জার অবস্থান হলো পার্ক এভিনিউতে। এটা একটি ঐতিহাসিক জায়গা। তাই স্টেট গভর্নমেন্ট এটাকে একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে ঘোষণা করে, ফলে কারো পক্ষে আর এটাকে ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব নয়। তাই দেখা যায়, আধুনিক আকাশচুম্বী সব অট্টালিকার মাঝখানে দুই শত বছরের পুরোনো এই চার্চটি কিছুটা বেমানান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাথলিক চার্চ। কেউ এখন আর সেখানে যায় না। তাই তারা এটাকে একটি নাইট ক্লাবে রূপান্তরিত করে ফেললো। এটা এখন আসলে একটি নাইট ক্লাব। কিন্তু বিল্ডিং আগের মতোই আছে। কারণ এটা একটি ঐতিহাসিক জায়গা।

আমি সেই পথ দিয়ে প্রতিদিন কলেজে যেতাম। একদিন হেঁটে যাওয়ার সময় একটা সাইন বোর্ডের দিকে খেয়াল করলাম, সেখানে লেখা আছে – “বৃহস্পতিবার রাতে এখানে মহিলাদের ফ্রি ড্রিঙ্কস পরিবেশন করা হবে।” আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম – “এটা আবার কোন ধরণের চার্চ! খ্রিস্ট ধর্মের কোন ফের্কা এটা!! বৃহস্পতিবার রাতে পবিত্র পানি ধরণের কিছু? আমি বুঝতে পারছি না। কী এটা! ”

যাইহোক, আমি আপনাদের নিকট এই চিত্রটি উপস্থাপন করছি একটা কারণে। এই ২০১৪ সালের আজকের পৃথিবীতে আমরা এটা পছন্দ করি আর নাই করি ….. অবশ্যই, আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি, পরকালে বিশ্বাস করি, রুহের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি, কলবে বিশ্বাস করি। আমরা অন্তরের পরিচ্ছন্নতা সংরক্ষণ করতে চাই, আমরা চাই আমাদের অন্তর সব ধরণের রোগ থেকে নিরাপদ থাকুক। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সব আলোচনাকে আপনি আত্মার সাথে সবন্ধযুক্ত বলতে পারেন। যদিও ইসলামিক পরিমণ্ডলে এটা সর্বোত্তম পরিভাষা নয়।

একটা মজার বিষয় জানেন? এই নতুন ইউরোপীয় চিন্তা ধারা যা গোটা বিশ্বের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়, এটা বলেনি যে আপনাকে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে হবে না। এই দর্শন এটা বলেনি।

মূলত এটা যা বলেছে তা হলো –
” হ্যাঁ, তুমি যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে চাও, করতে পারো। তুমি যদি চাও, মৃত্যু পরবর্তী জীবনেও বিশ্বাস করতে পারো। এটা তোমার অধিকার, তুমি যদি বিশ্বাস করতে চাও করতে পারো। এই বিশ্বাস তোমার নিজের কাছে রাখো। তোমার স্বর্গে যাওয়ার বিশ্বাস তোমাকে পরিত্যাগ করতে হবে না। যদিও আমি মনে করি এটা মূর্খতাপূর্ণ। তুমি যদি চাও তুমি বিশ্বাস করতে পারো। কোনো সমস্যা নেই।”

তারা যা বলেছে তা অনেক বেশি ভয়ংকর। তারা বলেনি যে আমরা তোমার সাথে একমত পোষণ করি না। তারা বলেছে – এতে কিছু যায় আসে না। তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো বা না করো এতে কারো কিছু যায় আসে না। বিজ্ঞান বাস্তব, তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো বা না করো। মেডিসিন বাস্তব, তুমি রুহের অস্তিত্বে বিশ্বাস করো বা না করো। তুমি স্বর্গে বিশ্বাস করো বা না করো রাজনীতি বাস্তব, অর্থনীতি বাস্তব। তাই চলো বাস্তব জগৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হই।

মুসলমানদের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে? আমাদের প্রায় অধিকাংশই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। আমরা যদি কোনো শিক্ষা পেয়ে থাকি তাহলে সেটা আধুনিক শিক্ষা। এর ফলে, যদিও আমরা আল্লাহতে অবিশ্বাস না করি, পরকালে অবিশ্বাস না করি এবং রূহ এবং অন্তরের বিষয়টাতেও অবিশ্বাস না করি, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ইউরোপীয় বিপ্লব মানুষের কাছ থেকে যে ধরণের আচরণ প্রত্যাশা করে আমাদের আচরণ মোটেও তার ব্যতিক্রম নয়। ব্যবহারিক দৃষ্টিকোন থেকে বলতে গেলে তাদের অভিপ্রেত আচরণ এবং আমাদের আচরণে কোনো ফারাক নেই।

আমি আপনাদের কিছু বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি যা বিষয়টা পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

ইনশাল্লাহ চলবে….

লেখক -উস্তাদ নোমান আলী খান

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..