• শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

মাদক বাণিজ্যেই সর্বনাশ কুমিল্লায়

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২১
  • ৩২

বাংলারজমিন২৪.কম ডেস্কঃ

কুমিল্লায় খুনোখুনির নেপথ্য ‘নায়ক’ মাদক বাণিজ্য। সঙ্গে রয়েছে অবৈধ বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সীমান্তে চোরাচালান কবজায় রাখার লড়াই। সীমান্তবর্তী এ জেলার পাঁচ উপজেলার অর্ধশতাধিক পয়েন্ট দিয়েই প্রতিনিয়তই ঢুকছে মাদক, অস্ত্র আর চোরাচালান দ্রব্য। ৮২ জন শীর্ষ এবং সব মিলিয়ে ১৮৩ জন ছোট বড় মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা করেছে সরকারি একটি সংস্থা। তারা বলছে, এর মধ্যে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মাদক এবং অন্তত ১৫ জন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা নির্বিঘ্ন করতে এর নিয়ন্ত্রকরা অর্থের বড় একটি অংশ পৌঁছে দিচ্ছেন প্রভাবশালীদের পকেটে। তবু এসব ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চাপা দ্বন্দ্ব। মাঝেমধ্যে এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়; যেমন নিয়েছিল সোহেল হত্যাকান্ডে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, কাউন্সিলর সোহেল ও হরিপদ কিলিং মিশন ছিল ৪৫ মিনিটের। মিশন শেষ করে দুর্বৃত্তরা বাইরে থেকে দরজা তালা দিয়ে চলে যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক, বালুমহাল ও চোরাচালানে জড়িত অনেকেই দিনে এক প্রভাবশালীর গ্রুপ করলেও রাতে অন্যজনের ব্যবসায়িক অংশীদার। প্রকাশ্যে কিছু বুঝতে না দিলেও ওই প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে সুদে আসলে আদায় করে নিচ্ছেন টার্গেটদের কাছ থেকে। কুমিল্লা সদরের বিবির বাজার ও গোলাবাড়ী চিহ্নিত মাদক পয়েন্ট। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এ পয়েন্টগুলো দিয়েই সিংহভাগ বিভিন্ন প্রকার মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চোরাচালান দ্রব্য হামেশাই প্রবেশ করে। সীমান্তে দায়িত্বরত বিভিন্ন সংস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের ম্যানেজ করেই মাফিয়ারা কাজ হাসিল করে।

স্থানীয়রা বলছেন, গুলিতে নিহত সোহেল সিটি কাউন্সিলর হওয়ার আগে তার যে ইতিহাস তা খুব মুগ্ধকর। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর তিনি নিজেকে অনেক সংশোধন করে নেন। এতে তিনি অনেকের গলার কাঁটা হয়ে ওঠেন। তবে নেপথ্যে থেকে তিনি অনেক কিছুতেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি অবশ্য বারবারই এসব অভিযোগকে তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করতেন। তিনি গোমতী নদীর সুজানগর, পাথরিয়াপাড়ার আটটি বালুমহালে অংশীদারি ভিত্তিতে ব্যবসা করতেন। নিজের প্রতিপক্ষের সঙ্গে সোহেল ব্যবসা করেন এ বিষয়টি ভালোভাবে নেননি স্থানীয় একজন প্রভাবশালী। তবে বালুমহালের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে তার। এ নিয়ে তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে কর্মকৌশলও ঠিক করতে বলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, আগামী মার্চে সিটি কপোরেশন নির্বাচন। সম্প্রতি পূজামন্ডপে কোরআন শরিফ রেখে আসার ঘটনার নেপথ্যের সবকিছু সরকারের উচ্চ পর্যায় অবহিত। সঙ্গে মাদক, বালুমহাল ও স্মাগলিং। সবকিছু নিয়ে কুমিল্লায় একটা অস্বস্তিকর অবস্থা।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, কুমিল্লায় গোমতী নদীতে ২০টির অধিক বালুমহাল রয়েছে। জেলা প্রশাসন এগুলো ইজারা দেয়। স্থানীয় মাফিয়ারা অল্প টাকায় ইজারা নিয়ে এ বালুমহাল থেকে শত কোটি টাকার ব্যবসা করে প্রতি বছর। নানা আশঙ্কা থেকে বর্তমানে অবশ্য জেলা প্রশাসন বালুমহাল ইজারা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। চলতি বছর নতুন করে কোনো মহাল ইজারা না দেওয়া হলেও মাফিয়াদের ড্রেজার মাঝেমধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কুমিল্লা মহানগরীর ২৭ ওয়ার্ডের মধ্যে পূর্বাঞ্চলের ওয়ার্ড ১৬ ও ১৭ নম্বর। এ ওয়ার্ড দুটির পর কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নে স্থলবন্দর বিবির বাজার। এ দুটি ওয়ার্ড থেকে ভারত সীমান্তের দূরত্ব ২ কিলোমিটার। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এ দুই ওয়ার্ডে মাদকের ছড়াছড়ি। এ দুই ওয়ার্ডে নিম্নবিত্তের মানুষ বেশি থাকায় তাদের দিয়ে মাদক আনা-নেওয়া করানো হয়। এ পথ দিয়ে প্রচুর অস্ত্রও প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এ দুই ওয়ার্ডের নিকটবর্তী গোমতী নদী। নদীর বালু ও মাটি নিয়েও রয়েছে আধিপত্য বিস্তারের প্রদর্শনী। এদিকে আদর্শ সদর উপজেলা ছাড়াও সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং উপজেলার সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ করে। বছর পাঁচেক আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কুমিল্লার শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা করে। এতে ক্ষমতাসীন দলের দুজন প্রভাবশালী নেতা ও দুজন উপজেলা চেয়ারম্যানের নাম ছিল।

সোমবার নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাথরিয়াপাড়ায় কাউন্সিলর কার্যালয়ে ঢুকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এতে কাউন্সিলর সৈয়দ মোহাম্মদ সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহা মারা যান। গুলিবিদ্ধ হন আরও পাঁচজন। প্রাথমিকভাবে পরকীয়া নিয়ে এ হত্যাকান্ড বলে চাউর হলেও এর পেছনে মাদক, অস্ত্র ব্যবসা, চোরাচালান, নদীর মাটি ও বালু বাণিজ্য রয়েছে বলেও জানা গেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানান, কাউন্সিলর সোহেল ও তার লোকজনের প্রভাব রয়েছে নগরীর পূর্বাঞ্চলে। এ প্রভাব ভাঙতে মরিয়া অন্য পক্ষ।

অভিযোগ রয়েছে- ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের একজন আওয়ামী লীগ নেতা তার মাদক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করতে সোহেলকে শেষ করার পরিকল্পনা করেছেন। নগরীর সুজানগরের একাধিক ব্যক্তি জানান, কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলে মাদকের আধিপত্য। তবে গোমতী নদীর আইলের সড়কটি পাকা হওয়ার পর মাদক ও অস্ত্রের আমদানি বেড়েছে। এসব এলাকায় মাদক আধিপত্য নিয়ে প্রায় সময়ই গুলিবিনিময় ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। নগরীর পূর্বাঞ্চলের ওয়ার্ডগুলোর রাজনীতিতে জড়িত প্রায় ৩০ ভাগ তরুণ মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িত। অস্ত্র রয়েছে ১০ ভাগ তরুণের হাতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা থেকে মাদক আটক করে। বেশি আটক হয় আদর্শ সদর উপজেলায়। এ ছাড়া সীমান্তের সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং উপজেলায় মাদক আটক হয়। কুমিল্লায় যত মাদক প্রবেশ করে তার মাত্র ১০ ভাগ আটক হয়।

সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ  বলেন, সব বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। সোমবারের ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। গত ১০/১১ মাসে জেলা পুলিশ রেকর্ড সংখ্যক মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ রেকর্ড সংখ্যক মাদক ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় এনেছে। সীমান্ত সংশ্লিষ্ট নানা অপরাধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করছি।

র‌্যাব-১১ ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২-এর অধিনায়ক সাকিব হোসেন বলেন, কাউন্সিলর সৈয়দ মোহাম্মদ সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহা নিহতের ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। অপরাধী শনাক্তের চেষ্টা করছি। তিনি আরেক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এলাকাটি সীমান্তবর্তী। এখানে মাদক ও অস্ত্রের প্রভাব রয়েছে বলে শুনেছি। আমরা সব বিষয় সামনে রেখে কাজ করব।

৪৫ মিনিটের মিশন : কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেলকে একাধিক গুলিতে মৃত্যু নিশ্চিত করে দুর্বৃত্তরা। পরে অফিসের ভিতরে গুলিবিদ্ধ সোহেলসহ চারজনকে রেখে দুর্বৃত্তরা বাইরে থেকে শাটারে তালা লাগিয়ে দেয়। স্থানীয়রা তালা ভেঙে তাদের উদ্ধার করে। মঙ্গলবার এমন বর্ণনা দেন ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ মো. রাসেল। রাসেলের বাড়ি নগরীর দ্বিতীয় মুরাদপুর। এদিকে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় ধরে কিলিং মিশন শেষ করে দুর্বৃত্তরা। তবে এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। পুলিশ সুপার বলেন, তারা কোনো অভিযোগপত্র এখনো পাননি। তবে ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও খুনিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রাসেল জানান, গোলাগুলির ঘটনা শুনে তিনি এগিয়ে যান। তিনি দেখেন কাউন্সিলর সোহেলকে অফিসে ঢুকে গুলি করে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা মুহুর্মুহু গুলি ও ককটেল ছোড়ে। পরে তিনি এগিয়ে গেলে তাকেও গুলি করে। তার হাঁটুর নিচে বিপরীতে গুলি লাগে।

প্রত্যক্ষদর্শী অন্তত ১০ জন জানান, পাথুরিয়া পাড়ার জগন্নাথ মন্দির এলাকার তিন রাস্তার মাথায় অবস্থিত দোকানঘরটিতে প্রথমে কাউন্সিলরকে সালাম দিয়ে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। তারা সবাই কালো পোশাক ও মুখোশ পরা ছিল। তখন আসরের নামাজের জামাত হচ্ছিল। প্রথমদিকে র‌্যাবের লোকজন মনে করে তারা কোনো প্রতিরোধের চেষ্টা করেননি। হঠাৎ গুলির শব্দ।

আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার : কুমিল্লায় প্রকাশ্য দিবালোকে কাউন্সিলর ও তার সহযোগীকে হত্যার ঘটনার পর আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সোহান সরকার বলেন, তাদের ধারণা, সোমবারের ঘটনায় এ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো ব্যবহৃত হয়। তবুও পুলিশ ব্যাপক বিশ্লেষণ করবে।

গতকাল বিকাল ৩টায় কুমিল্লা শহরের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড, সংরাইশ, বড়পুকুর পাড়, ডক্টর রহিমের গলির বেলাল মিয়ার তাজীহা লজ বাসার বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে বাড়ি ও বাউন্ডারি ওয়ালের মাঝখানে তিনটি কাঁধ ব্যাগ দেখতে পেয়ে তারা পুলিশকে জানায়। পুলিশ ব্যাগ তল্লাশি করে দুটি এলজি, একটি পাইপগান, আনুমানিক ১৫-২০টি অবিস্ফোরিত বোমাসদৃশ বস্তু, তিনটি কালো ব্যাগ, দুটি কালো জামা ও ১২ রাউন্ড তাজা বুলেট উদ্ধার করে।

পুলিশের ধারণা, ব্যাগগুলো খুনিদের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হাফ কিলোমিটার উত্তর থেকে এগুলো জব্দ করা হয়।

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..