• বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন

সিনহা হত্যার আসামিরা আদালতে

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১
  • ২৮

বাংলারজমিন২৪.কম ডেস্কঃ

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে বরখাস্ত ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামিকে দ্বিতীয় দিনের মতো আদালতে হাজির করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) কক্সবাজার কারাগার থেকে সকাল পৌনে ১০টায় তাদের আদালত চত্বরে হাজির করা হয়। গতকাল মামলার ১২ আসামির আইনজীবীরা আদালতে সাক্ষীকে জেরা করলেও অন্য তিনজনের আইনজীবীর জেরা আজ হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে সোমবার (২৩ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাঈলের আদালতে মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের সাক্ষ্যদানের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ চলবে আগামী বুধবার (২৫ আগস্ট) পর্যন্ত।

গতকাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, প্রথমদিনে সাক্ষ্যদানে আদালতে ৩ জন সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন। তবে সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে একমাত্র বাদীর। পরে ওসি প্রদীপ, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত ও এএসআই লিটন মিয়ার আইনজীবী ছাড়া অন্য ১২ আসামির আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করেছেন। সাক্ষীকে অন্য আইনজীবীদের জেরা আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে।

মামলায় সাক্ষ্যদানের জন্য ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে তিনদিনে প্রথম দফায় ১৫ জনকে উপস্থিত থাকতে ইতোমধ্যে সমন জারি করা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী।

এদের মধ্যে প্রথমদিনে সাক্ষ্যদানের জন্য মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস, ঘটনার সময় সঙ্গে থাকা সিনহার সঙ্গী শহিদুল ইসলাম সিফাত ও টেকনাফের মিনাবাজার এলাকার মোহাম্মদ আলী উপস্থিত হয়। তবে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে শুধু মামলার বাদীর।

পিপি ফরিদুল বলেন, বিচার শুরুর প্রথমদিনে মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পরে ৩ জন ছাড়া ১২ আসামির আইনজীবীরা সাক্ষীকে দীর্ঘ সময় ধরে জেরা করেন। পরে বিচারক ৩ জন আসামির আইনজীবীদের জেরা আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে আদেশ দিয়ে আদালতের কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণা করেন।

এর আগে সকাল সোয়া ১০ টায় মামলার বাদী সাক্ষ্যদানের আদালতের এজলাসে হাজির হলে আসামিদের আইনজীবীরা নানা আপত্তি তুলে ধরেন। পরে বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর সোয়া ১১টায় বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন। তা চলে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। এরপর ১২ জন আসামির আইনজীবীরা একের পর একজন সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন।

এক পর্যায়ে বিকেল ৩টায় বিচারক আদালতের কার্যক্রম এক ঘণ্টার জন্য বিরতি ঘোষণা করেন। এরপর বিকেল ৪টায় আবারও বিচারকাজ শুরু হয়। তা শেষ হয় বিকাল ৫টায়।

এ সময় আদালত থেকে বের হয়ে মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বলেন, সিনহা হত্যা ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে মামলার এজাহারে যে বর্ণনা দিয়েছিলাম মূলত তা-ই আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন তারই ভিত্তিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করছেন।

এছাড়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে সিনহা হত্যার ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে তুলে ধরা হয়েছে; তাও আদালতের কাছে উপস্থাপন করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছি, বলেন মামলার বাদী।

শারমিন বলেন, আমার সাক্ষ্যের ওপর এখনো ৩ জন আসামির আইনজীবীর জেরা অসম্পন্ন রয়েছে। আগামীকাল তা অনুষ্ঠিত হবে। আশা করছি, আদালতের কাছে আমরা ন্যায়-বিচার পাব।

বাদীর আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, সাক্ষ্যদানের শুরু থেকেই আসামিদের আইনজীবীরা বিচারকাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য নানা চেষ্টা চালিয়েছে। তারা আদালতের কাছে ১১টি আপত্তিপত্র জমা দিলেও সাক্ষ্যদান সুষ্ঠুভাবে শুরু হয়েছে।

আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে আসামি ওসি প্রদীপ ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতের আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত বলেন, মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগে আসামিদের অভিযোগ গঠন এবং অভিযোগ গঠনের আদেশ সম্পর্কে জানতে হবে যে তাদের (আসামিদের) বিরুদ্ধে কি ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আসামিরা এখনো তা অবগত নয়।

গত ২৭ জুন অভিযোগ গঠন করে আদেশের পর সেগুলোর নথি পেতে আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেগুলো পাইনি মন্তব্য করে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, অভিযোগ গঠনের নথি আবেদনের পরও না পাওয়ার বিষয়টি আদালতের কাছে তুলে ধরে পিটিশন দায়ের করি। আদালত বিষয়টি আমলে শুনানিতে সাক্ষীকে আগামীকাল জেরার জন্য সময় দিয়ে আদেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি ফরিদুল আলম বলেন, করোনার কারণে মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। এখন সাক্ষ্য যখন শুরু হয়েছে তা আর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ নেই।

এ নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার চূড়ান্ত বিচারকাজ সম্পন্ন করতে পারবেন আশাবাদ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী।

গত ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই সাক্ষ্যদানের দিন ধার্য থাকলেও করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে যায়। পরে গত ১৬ আগস্ট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ২৩, ২৪ ও ২৫ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করে আদেশ দেন।

গত বছর ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর আবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এ ঘটনায় সেই সময় সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় লিয়াকত আলীকে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় একটি এবং রামু থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করে।

সিনহা নিহতের ৬ দিন পর সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও সাবেক ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার অভিযোগে টেকনাফ থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষী এবং শামলাপুর চেকপোস্টে ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনকারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এক পর্যায়ে পলাতক থাকা অবস্থায় টেকনাফ থানার সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

সর্বশেষ গত ২৪ জুন মামলার একমাত্র পলাতক থাকা আসামি টেকনাফ থানার সাবেক এএসআই সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

আত্মসমর্পণকারী সাবেক এএসআই সাগর দেব ছাড়া র‌্যাব ১৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ওসি প্রদীপ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্ত শেষে গত বছর ১৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন র‌্যাব ১৫-তে দায়িত্বরত সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

মামলার আসামিরা হলেন- বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল-মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের তিন সদস্য এসআই মোহাম্মদ শাহজাহান, কনস্টেবল মোহাম্মদ রাজীব, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, পুলিশের মামলার তিন সাক্ষী নুরুল আমিন, নেজাম উদ্দিন, মোহাম্মদ আয়াজ, টেকনাফ থানার সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাবেক এএসআই সাগর দেব।

গত ২৭ জুন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ইসমাইল এ মামলার অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য গত ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দিন ধার্য করেন। এতে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই ধার্য দিনগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..