• রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন

তরুণেরা চাকরি না পাওয়ার কারণ কী?

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ মে, ২০২১
  • ৯১

বাংলারজমিন২৪.কম ডেস্কঃ

পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রতিযোগিতায় প্রতিবছর ঢুকছেন লাখ লাখ তরুণ। ঘুরেফিরে বারবার একটি কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে, কেন চাকরি পাচ্ছেন না তরুণেরা। কোন কোন দক্ষতার অভাবে তাঁদের কাছে ধরা দিচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরি। তরুণদের নানা সমস্যা ও তাঁর সমাধান নিয়ে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।

দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির পোর্টাল বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর জানান, প্রতিবছর চাকরির বাজারে প্রায় তিন লাখ তরুণ যুক্ত হচ্ছেন। এই তরুণদের জন্য চাকরির বাজার বাড়ছে না। সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়োগ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হয়তো পদ আছে ১৫ থেকে ২০টি। কিন্তু তাতে সিভি জমা পড়ছে এক লাখ থেকে দেড় লাখ।

ফাহিম মাশরু বলেন, চাকরির বাজারে তরুণদের দক্ষতা নিয়ে একটি প্রশ্ন উঠছে। তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষতা দেখিয়ে চাকরি পেলেও একটি বড় অংশ দরকারি নানা দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যেসব সিভি জমা পড়ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে তরুণেরা প্রত্যাশিত বেতনের অংশে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে বসছেন। কিন্তু চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের হয়তো ওই পদের জন্য সে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ নেই। তখন চাকরিপ্রার্থী যত ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন হোন না কেন, তাঁর সিভি এড়িয়ে যান চাকরিদাতারা। আবার চাকরিপ্রার্থী হয়তো ভালো ফল নিয়ে পাস করেছেন, কিন্তু যখন লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়, তখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ভালো ইংরেজি বা বাংলায় কিছু লিখতে পারছেন না। এসব কারণে তরুণেরা চাকরি পাচ্ছেন না।’

তরুণদের জন্য চাকরির পরামর্শ দিতে গিয়ে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমাদের দেশের তরুণদের বেশি বেতনের চাকরির ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমে বেতন কম হোক, একটা চাকরিতে ঢুকে যেতে হবে। এটি করলে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কিছু একটা যোগ হয়। আর এটি দেখিয়ে আরও ভালো চাকরিতে আবেদন করতে পারেন তিনি। এভাবে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া যায়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, ভালো ইংরেজি বা বাংলা লেখার দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভিন্ন স্থানে চাকরির মেলায় অংশ নিয়ে নিজের নানা দক্ষতা বাড়িয়ে নিতে পারেন। এভাবে এগিয়ে গেলে পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া সহজ হবে।’

তরুণদের নানা ধরনের দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেন করপোরেট কোচের মুখ্য পরামর্শক ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ যিশু তরফদার। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সব সময় তরুণদের কাজে আসছে না। যেসব তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বা দর্শন পড়ছেন, তাঁরা পড়াশোনা শেষে সাহিত্য সমালোচক বা দার্শনিক হচ্ছেন না। চাকরির পড়াশোনা করে কেউ কেউ চাকরি পেলেও একটি বড় অংশ চাকরি পাচ্ছে না। এই তরুণেরা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটারের বিভিন্ন দক্ষতা, ভিডিও এডিটিং, ফটোগ্রাফি, নানা বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি কোর্স করেন, তাহলে পড়াশোনা শেষে এসব দক্ষতা দেখিয়ে চাকরি নিতে পারেন। এসব দক্ষতাই তাঁকে আর দশজন থেকে এগিয়ে রাখবে। এ দেশের প্রচলিত পড়াশোনা করে তরুণেরা চাকরি না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।

যিশু তরফদার বলেন, তরুণেরা যদি কারিগরি শিক্ষায় নিজেদের শিক্ষিত করে একটি ডিপ্লোমা কোর্স করেন, পাশাপাশি ইংরেজি দক্ষতা, যেমন আইইএলটিএস পরীক্ষা দিয়ে মোটামুটি মানের একটা স্কোর করেন, তাহলে অনায়াসেই বিদেশে ভালো চাকরি জুটিয়ে নিতে পারেন। এমনকি এসব চাকরি নিয়ে অন্য দেশের নাগরিকত্বও নিতে পারবেন। যে সময় এসব শিক্ষা নিয়ে তিনি এগিয়ে যাবেন, সেই সময় হয়তো তাঁর আরেক বন্ধু চাকরিই পাচ্ছেন না। শিক্ষাজীবনকে তারুণ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বিবেচনা করে যিশু তরফদার বলেন, এই সময় একজন তরুণ যতটা নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবেন, অন্য সময় ততটা পারবেন না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ধরনের সফট স্কিল, যেমন: যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, ভালো কথা বলা, লেখা—এসব দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে চাকরি পেতে তাঁর সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তরুণদের নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি)। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট এজাজ আহমেদ বলেন, দেশে যে পরিমাণ পাস করা তরুণ প্রতিবছর বের হচ্ছেন, চাকরি সে পরিমাণ নেই। সে জন্য বেকারের পরিমাণ বাড়ছেই। বিশ্ববিদ্যালয় একজন তরুণকে একাডেমিক পড়াশোনার শিক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু চাকরিতে কীভাবে আবেদন করবেন বা কোনো কোনো দক্ষতা অর্জন করলে তরুণদের চাকরি পাওয়া সহজ হবে, সে শিক্ষা দিচ্ছে না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণদের নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তরুণদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা ৮০টি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বলেছে, তারা যে ধরনের চাকরিপ্রার্থী খুঁজছে, তা পাচ্ছে না। চাকরির আবেদনকারীদের মধ্যে তারা নানা দক্ষতার ঘাটতি দেখছে। ভালো বলতে পারা, লিখতে পারার দক্ষতার অভাব দেখছে তারা। তারা চায় উদ্যমী আর চৌকস তরুণ, যে তরুণকে কাজ করার কথা বলতে হবে না। নিজেই নিজের উদ্যোগে উদ্ভাবনী দক্ষতায় কাজ করবেন—এমন তরুণদের চাকরি দিতে চায় তারা।

ভবিষ্যতে চাকরির বাজার আরও কঠিন হবে বলে মনে করেন এজাজ আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, যা মানুষের কাজ কমিয়ে দিয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগে আগে অফিসের কর্মীদের যাওয়া-আসা, ছুটি নেওয়া, সময় ব্যবস্থাপনা দেখভাল করার জন্য আলাদা কর্মী নিয়োগ দেওয়া থাকত। কিন্তু এখন সফটওয়্যারের মাধ্যমে এ কাজ কম্পিউটারে করা সম্ভব হচ্ছে। হিসাব বিভাগের অনেক কাজ সফটওয়্যারে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এভাবে চাকরির বাজারে কর্মীর সংখ্যা কমছে। তাই সামনের দিনগুলোতে চাকরি পেতে তরুণদের এমন হতে হবে, যা অন্যদের থেকে তাঁকে আলাদা করে। উদ্ভাবনী শক্তি বা সমস্যা সমাধানের জন্য এমনভাবে দক্ষ হতে হবে, যা দেখে চাকরিদাতারা তাঁকে চাকরি দেবে। নিজেদের সময়ের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারলেই চাকরি দেখা পাবেন তরুণেরা।

চাকরিদাতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তরুণদের মধ্যে একটি সহজাত প্রবণতা দেখা গেছে, তা হলো তাঁরা সিভি কপি পেস্ট করেন। এমন কমন সিভি চাকরিদাতারা দেখলেই বোঝেন। সে জন্য তাঁরা চাকরির ডাক পান না। চাকরিদাতাদের নজরে আসতে হলে ব্যতিক্রম সিভি দিতে হবে। এ ছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, চাকরি প্রার্থীরা যে ই–মেইল ঠিকানা ব্যবহার করেন, তা হয়তো তাঁর ডাকনাম বা সাংকেতিক কিছু যেমন, ‘লিটু’, ‘ক্লেভার বয়’, ‘ভুত’—এসব নাম ব্যবহার করা। এগুলো দেখে চাকরিদাতারা চাকরিপ্রার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নেন, যা চাকরি পেতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ জন্য ফরমাল নাম ব্যবহার করে ই–মেইল ঠিকানা দিতে হবে।

এসিআই লিমিটেডে মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক মঈনুল ইসলাম তরুণদের উদ্দেশে বলেন, চাকরির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিল রেখে সিভি পাঠান। চাকরিপ্রার্থীদের অবশ্যই একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, কখনো একই সিভি সব চাকরিতে দেওয়া যাবে না। চাকরির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিল রেখে সিভি দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। মূলত, চাকরির বর্ণনা দেখেই সিভি দিতে হবে।

মঈনুল ইসলাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই নতুন প্রার্থীরা একটি সাধারণ ভুল করছেন। তা হলো জীবনবৃত্তান্তে যে তথ্য দরকার নেই, সে তথ্য জুড়ে দিচ্ছেন। দরকার নেই বা প্রাসঙ্গিক নয়—এমন অভিজ্ঞতা লেখা ঠিক নয়। যে চাকরির জন্য আবেদন করছেন, কেবল তার জন্য উপযুক্ত, এমন অভিজ্ঞতা উল্লেখ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এ ছাড়া জীবনবৃত্তান্তে রেফারেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকে এমন রেফারেন্স দেন যে যাঁকে ফোন করলে বা যোগাযোগ করলে দেখা যায়, আবেদনকারীকে তিনি চিনছেন না। এ ক্ষেত্রে চাকরিদাতারা ওই প্রার্থী সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। জীবনবৃত্তান্তে ছোট ছোট ভুলের কারণে চাকরিদাতারা প্রার্থীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

মঈনুল ইসলাম বলেন, নতুন চাকরিপ্রার্থীরা সাধারণত তাঁদের প্রাথমিক তথ্যগুলো সিভিতে উল্লেখ করবেন। যে চাকরির আবেদন করছেন, তার সঙ্গে মিলিয়ে কোনো কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে তা উল্লেখ করবেন। এ ছাড়া তিনি শিক্ষাজীবনে কোনো প্রজেক্ট করে থাকলে তা উল্লেখ করতে পারেন। ইন্টার্নের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করতে পারেন। ভালো প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন করা থাকলে অনেক সময় ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। মনে রাখতে হবে, সিভি লেখাও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিযোগিতা। যাঁর সিভি যত ভালো হবে, চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতায় তিনি তত এগিয়ে থাকবেন।

আরো পড়ুন কিভাবে সিভি তৈরি করতে হবে বা কিভাবে সিভি তৈরি করবঃ-

বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের শুরু থেকেই নানা প্রয়োজনে জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি তৈরি করতে হয়। আর বৃত্তি বা কোনো সভা-সম্মেলন-ফেলোশিপে অংশগ্রহণের জন্যও এখন সিভি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজের পরিচয়, অর্জন, যোগ্যতার কথা সংক্ষেপে কীভাবে তুলে ধরব? সিভিতে কী থাকবে আর কী থাকবে না? পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) সহকারী অধ্যাপক ও ব্যবসায় যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাইফ নোমান খান। নমুনা হিসেবে এখানে বাংলায় লেখা সিভি তুলে ধরা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেহেতু ইংরেজি ভাষায় সিভি লিখতে হয়, তাই একই নিয়ম ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

সিভিতে যা যা থাকবে

নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা

সিভির প্রথম অংশে পুরো নাম লিখতে হবে। কোনোভাবেই ডাকনাম বা ছদ্মনাম লেখা যাবে না। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্রে যে নাম লেখা আছে তা-ই লিখতে হবে। নামের আগে মিস্টার বা মিসেস ব্যবহার করা যাবে না।

ঠিকানা লেখার ক্ষেত্রে চিঠিতে যোগাযোগ করা যায়, এমন ঠিকানা স্পষ্ট কিন্তু সংক্ষিপ্ত আকারে লিখতে হবে। যোগাযোগের জন্য দিতে হবে মুঠোফোন নম্বর। অপ্রয়োজনে ২-৩টি ফোন নম্বর লেখা যাবে না। আর বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে ই-মেইল ঠিকানার ক্ষেত্রে। iamgreat@gmail. com বা sweetdreams@ymail. com—এ ধরনের হাস্যকর ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করা যাবে না। নিজের নামের সঙ্গে মেলে এমন সংক্ষিপ্ত ই-মেইল ঠিকানা তৈরি করে সিভিতে ব্যবহার করতে হবে।

লিংকড–ইন প্রোফাইলের আইডি ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজন না হলে ফেসবুক আইডি যুক্ত না করাই শ্রেয়। তবে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট কিংবা নিজ কাজের পোর্টফোলিও প্রকাশিত হয়েছে এমন ওয়েবসাইটের নাম লেখা যেতে পারে।

ছবি

সিভিতে যে ছবি যুক্ত করবেন তা যেন সাম্প্রতিক সময়ে তোলা হয়। ছবির পটভূমি এক রঙের হতে হবে। চুল কিংবা দাড়ি পরিপাটি থাকতে হবে ছবিতে। চেহারা বোঝা যায় এমন যেকোনো ছবি ব্যবহার করতে পারেন।

পেশাগত লক্ষ্য

সিভিতে অবশ্যই আপনার পেশাগত লক্ষ্য লিখতে হবে। ভাষা হবে সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল, গোছানো ভাষায়। যদি ইংরেজিতে লেখেন, বানান বা ব্যাকরণ যেন ভুল না হয়। যে পদে আবেদন করবেন তার সঙ্গে সম্পৃক্ত লক্ষ্য লিখতে হবে। আজগুবি, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা কাল্পনিক কোনো বাক্য লেখা যাবে না।

শিক্ষা

সদ্য যে ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সেটা লিখতে হবে প্রথমে। কোন বিষয়ে, কোন অনুষদে পড়েছেন, কত সালে পরীক্ষা দিয়েছেন, গ্রেড পয়েন্ট বা ফলাফল কী ছিল, এসবও উল্লেখ করতে পারেন। এখনো পাস করে না থাকলে ‘পরীক্ষার্থী’ শব্দটি লিখুন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে ক্রমানুসারে মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত ফলাফলের তথ্য লিখতে হবে।

একাডেমিক প্রকাশনা বা প্রকল্প

স্নাতকপর্যায়ে পড়াকালীন কোনো গবেষণা বা রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তা লিখুন। প্রকৌশল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজের কোনো প্রকল্পের নাম যুক্ত করতে পারেন। যাঁরা ব্যবসায়ে প্রশাসনে পড়ছেন, তাঁরা ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করলে তার রিপোর্টের নাম লিখুন। কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিলে তার সংক্ষিপ্ত তথ্য যুক্ত করুন।

পেশাগত অভিজ্ঞতা

সাধারণত স্নাতকপড়ুয়া বা সদ্য উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সরাসরি পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকে না। কিন্তু যে পদের চাকরির জন্য সিভি তৈরি করছেন, সেই সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে তা যুক্ত করুন। যেমন কোনো মেলায় বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করলে তা লিখুন বা কোনো কল সেন্টারে কাজ করে থাকলে তা-ও লিখতে পারেন। কোন পদে কাজ করেছেন, কত দিন করেছেন তা উল্লেখ করুন। কোনো সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে আয়োজক হিসেবে কাজ করে থাকলে তা-ও লিখুন।

স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ

আপনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যে কাজ বা সংগঠনে যুক্ত তার তথ্য লিখতে হবে। কত দিন ধরে কাজ করছেন, কোন পদে কাজ করছেন তা লিখুন। প্রয়োজন হলে, প্রতিটি কাজের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত করে কাজের বর্ণনা দিন।

কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ

বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে যেসব কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন বা প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন তার তালিকা যুক্ত করতে হবে। চাকরির পদের সঙ্গে গুরুত্ব বুঝে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের তথ্য যোগ করুন। কর্মশালার নাম ও আয়োজকদের তথ্য সংক্ষিপ্ত করে লিখুন। ধরুন, আপনি বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরির জন্য সিভি তৈরি করছেন, তাহলে বিক্রয় ও বিপণন-সম্পর্কিত তথ্য যোগ করুন। অনলাইনের মাধ্যমে কোনো ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ নিলে তা-ও সিভিতে যুক্ত করুন।

ভাষা দক্ষতা

সাধারণভাবে বাংলাদেশে চাকরির আবেদনের জন্য বাংলা ও ইংরেজি জানা আবশ্যিক। ইংরেজি ভাষা দক্ষতা-সংশ্লিষ্ট কোনো পরীক্ষা—যেমন আইইএলটিএস বা টোয়েফলে অংশ নিলে তার স্কোর লিখুন। অন্য কোনো ভাষা জানলে সেটিও উল্লেখ করুন।

কম্পিউটার-দক্ষতা

যে পদের জন্য সিভি তৈরি করছেন, সেই পদের কথা মাথায় রেখে কম্পিউটার–দক্ষতা লিখতে হবে। এখন সব পর্যায়ের চাকরির জন্য মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্ট জানাকে সাধারণ দক্ষতা হিসেবে ভাবা হয়। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্টের কাজ খুব ভালো জানলে তা অবশ্যই সিভিতে যুক্ত করবেন। ডেটা অ্যানালাইসিস, ম্যাক্রো কিংবা মাইক্রোসফটের কোনো প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকলে তা লিখতে পারেন। এ ছাড়া টেকনিক্যাল সফটওয়্যার যেমন ম্যাটল্যাব বা এসপিএসএস শেখা থাকলে সেটিও উল্লেখ করুন।

শখ ও আগ্রহ

নিজের দু-একটি আগ্রহ ও শখের কথা লিখতে পারেন।

রেফারেন্স

সদ্য স্নাতকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই ভালো রেফারেন্স হিসেবে কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষককে জানিয়ে তাঁর নাম ও পদবি ব্যবহার করুন। কখনো কখনো চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে রেফারেন্সে যাঁর নাম থাকে, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাই সঠিক পদ ও পরিচয় ব্যবহার করুন। অন্য কোনো পেশার পরিচিত কোনো পেশাজীবীর নাম ও পদবি যুক্ত করতে পারেন।

অঙ্গীকারনামা

সিভিতে যুক্ত আপনার সব তথ্য সঠিক ও নির্ভুল তা লিখতে হবে। লেখার নিচে আপনার স্পষ্ট স্বাক্ষর থাকতে হবে। চাকরিদাতা আপনার তথ্য যাচাই করার আইনগত অধিকার রাখেন, তাই কোনো ভুল তথ্য দেবেন না।

মনে রাখা জরুরি

■ অনেকেই অন্যের জীবনবৃত্তান্ত প্রায় হুবহু অনুকরণ করে নিজের সিভি তৈরি করেন। এটা একেবারেই ঠিক নয়। চাকরিদাতারা কিন্তু সিভিতে চোখ বুলিয়েই ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। অন্য কাউকে দিয়ে সিভি তৈরি করালেও সেটা ধরা পড়ে যায়। যে নিজের সিভি নিজে তৈরি করতে পারে না, একজন চাকরিদাতা কোন ভরসায় তাঁকে দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ দেবেন? তাই জীবনের প্রথম সিভি নিজেকেই তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেট ঘেঁটে দারুণ কিছু সিভির নমুনা পাওয়া যাবে। সেগুলো দেখে একটা ধারণা নিতে পারেন। তারপর নিজের সিভি নিজেই লিখুন। এখানে আমরা একটা নমুনা সিভি তুলে ধরেছি স্রেফ ধারণা দেওয়ার জন্য। কোনোভাবেই এটা হুবহু অনুকরণ করা ঠিক হবে না।

■ সিভিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে অনুচ্ছেদ বা প্যারাগ্রাফের বদলে বুলেট পয়েন্ট ব্যবহার করতে পারেন। কখনোই ‘প্রথম পুরুষে’ সিভি লিখবেন না। যেমন ‘২০১৬ সালে আমি জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছি’ না লিখে বুলেট দিয়ে লিখতে হবে, ‘জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম, ২০১৬’। সংবাদপত্রের শিরোনাম যেমন স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত হয়, তেমন করে তথ্য যুক্ত করতে হবে।

■ প্রথম সিভি তৈরির পর তা অভিজ্ঞ দু-একজনকে দেখিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক বা বিভাগের কোনো সিনিয়রের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

■ সিভিতে কোনোভাবেই বানান ভুল করা যাবে না। বারবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে, সম্পাদনা করতে হবে। সিভি যেন কোনোভাবেই দুই পৃষ্ঠার বেশি না হয়। এক পৃষ্ঠায় শেষ করতে পারলে ভালো।

■ একই সিভি অনেক জায়গায় জমা দেওয়া বা ই-মেইল করা ঠিক হবে না। চাকরি ও পদভেদে সিভির ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। পেশাগত লক্ষ্য কিন্তু একেক পদের জন্য একেক রকম হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

■ এ-ফোর আকারের কাগজের মাপে সিভি তৈরি করতে হবে। চারপাশে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ‘মার্জিন’ রাখতে হবে। সাদা কাগজে কালো কালিতে তথ্যগুলো লেখা থাকবে। সিভির পটভূমিতে অন্য কোনো রং ব্যবহার না করাই ভালো।

■ শুধু সিভি কোথাও জমা দেবেন না বা ইমেইল করবেন না। সিভির সঙ্গে ‘কভার লেটার’ যুক্ত করতে হবে। আপনি কেন চাকরির জন্য আবেদন করছেন, আপনি কেন যোগ্য, তা সংক্ষিপ্ত আকারে কভার লেটারে লিখতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..