• সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

বাংলা গরিবেরা পড়ে, বাংলা পড়লে মানুষ গরিব থাকে?

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৬
সম্পাদকীয়

বাংলারজমিন২৪কম/ডেক্স 

মাতৃভাষাকে আমি মানুষের দ্বিতীয় আত্মা বলি। সে হিসেবে বাঙালি অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে বাংলা ভাষা।এই ভাষার পরিপুষ্টি আর লালন যেমন জরুরি, তেমনি দরকার এর প্রসারণ। কিন্তু এটা সম্ভব কীভাবে? আজ চারদিক থেকে যখন বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ আসছে, তখন প্রস্তুতিটা কেমন হবে, নিশ্চয়ই ভাবতে হবে।

বিশ্বায়ন বা গোলকায়নের নামে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আরম্ভ করে সর্বত্র চলছে একটি বিশেষ ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা। আমাদের অনেকে বুঝে বা না বুঝে সেই আধিপত্যাবাদী মনোভাবের পক্ষে কাজ করছেন।ভাষা হিসেবে, সাহিত্য হিসেবে, সংস্কৃতি হিসেবে বিশ্বের সব ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকেই আমরা শ্রদ্ধা জানাবো। এমন কি উর্দুভাষীরা যে ১৯৭১ সালে আমাদের উপর জঘন্য অত্যাচার চালানো, যেসব কথা মনে রেখেও ভাষা হিসেবে উর্দুকে আমরা শ্রদ্ধা করবো। কিন্তু আমাদের ঘর থেকে, রাষ্ট্র থেকে, অস্তিত্ব থেকে বাংলা নির্বাসিত হলে আমরা মানতে পারবো না, বাঁচতে পারবো না। সে প্রক্রিয়াটাই চলছে। তবে অত্যন্ত ধীরে। আজ এমন মনে হয়, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা থাকলেও আজ আর রাষ্ট্রভাষা নয়। ইংরেজির বিরোধিতা আমরা করছি না; তবে বাংলাদেশে বাংলাভাষাকে হটিয়ে দিয়ে ইংরেজি প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা তার বিরোধিতা আমাদের করতেই হবে।

শুধু বিরোধিতার মধ্যে সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত নেই। বিরোধিতা একরম প্রতিক্রিয়া; ক্রিয়া নয়। আমরা ক্রিয়া চাই।এই ক্রিয়া করতে হলে চিন্তাকে আধুনিক ও প্রসারিত করে এগুতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে বাঙালি মধ্যবিত্তের দারিদ্র্যের অহংকার ভেঙে। মধ্যবিত্তের মধ্যে দারিদ্র্য নিয়ে অহংকার আছে। সেটা মনের দারিদ্র্য, ধনেরও। কিন্তু দারিদ্র্যমাত্রই মানুষকে যে দুর্বল ও ছোট করে, এটা অনেক সময় তারা মানে না। ধনের দারিদ্র্য চোখে দেখা যায়, মনের দারিদ্র্য যায় না। কিন্তু যখন প্রকাশ হয়ে পড়ে তখন একজন নয়, একত্রে দেখে সেটা বহুজন। এই দারিদ্র্যকে ইন্ধন দেবার ব্যক্তি বা সংস্থার অভাব নেই। বিশ্বসম্প্রসারণবাদ এমনভাবে এগিয়ে আসছে যে, তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে প্রায় সর্বত্র। নিজেদের স্বার্থে তারা সব করতে পারে। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ও সংস্থার ব্যানারে তারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামান্য দোষ-ত্রুটি এমনভাবে প্রকাশ আরম্ভ করল এবং এনিয়ে রাজপথ মিছিল-মিটিং করতে থাকল, যাতে মনে হলো আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লেখাপড়া হয় না ছাত্রীরা নিরাপদ নয়, ছাত্ররা শুধু বোমাবাজি করে, সেশন জ্যাম লেগে থাকে বছরের পর বছর ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে তখন ছিল বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রী আহরণকাল। পরে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুগপৎ অপপ্রচার কারা করিয়েছে। যারা সেই গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়েছিল, কিছুদিন বাদে তারা অনুতপ্ত হলেও দেশের ক্ষতি যা হবার ততক্ষণে হয়ে গেছে। আজ বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এগুলোর মধ্যে গোনা দু-একটি ছাড়া আর কোনোটিতেই বাংলা পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যেখানে বিশ্বসম্প্রসারণবাদের পক্ষে, সেখানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাষ্ট্র বা সরকার ভর্তুকি দিয়ে বাংলা পড়বার জন্য ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির কাজে এগিয়ে আসবে সে আশাও বৃথা। কেউ সরকারের কাছে চাইতে বা দাবি জানাতে পারে, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সে দাবি দাবিয়ে রাখাই হবে, পূরণ হবে না। সরকারের মনোভাব যদি এমন হয়, তাহলে কি আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিতে পারি না?

আমাদের উদ্দেশ্য যদি হয় বাংলা-প্রসার, তবে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্ব-খরচে বাংলা পঠন-পাঠনকে আমরা উৎসাহিত করতে পারি।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব আছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে বাংলা ভাষার প্রতি অনুগত রেখে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সার্বিকভাবে কার্যকর করারজন্যেই প্রয়োজন বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরো বেশি পঠন-পাঠনের আয়োজন। বন্ধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানসিক-দারিদ্র্যে ভুগলে চলবেনা। গরিব ছেলেমেয়েদের স্বল্প ব্যয়ে লেখাপড়া করানোর দাবি বা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো বলে কি আমরা চাইবো যে, যাদের স্ব-খরচে বাংলা পঠন-পাঠনের সামর্থ্য আছে তারাও না-পড়–ক? যদি তা চাওয়া হয়, সেটা হবে মনের দারিদ্র্য! স্বচ্ছল মানুষের মনে কি বাংলার প্রসার ঘটবে না? বাংলা কি শুধু গরিবের ভাষা হয়ে থাকবে? বিশ্বসম্প্রসারণবাদীরা অবশ্য এটাই চায়। তারা দেখতে চায়, বাংলা গরিবেরা পড়ে, বাংলা পড়লে মানুষ গরিব থাকে। আর তাদের ভাষা ধনীরা শেখে; তাই সে ভাষা শিখলে ধনী হওয়া যায়। বাংলা পঠন-পাঠন প্রসারের বিপক্ষে আমাদের দেশেও কেউ জেনে, কেউ না-জেনে এই বিশ্বসম্প্রসারণবাদীদের পক্ষে কাজ করছে। কিন্তু যারা নিজেদের সচেতন বলে দাবি করেন, তারা? তারা কি আজও বসে থাকবেন বাঙালি মধ্যবিত্তের দারিদ্র্যের অহংকার নিয়ে! দেশ ও স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই যে আজ সব শ্রেণির অর্থাৎ ধনী-গরিব সবার কাছে বাংলার পঠন-পাঠন পৌঁছান প্রয়োজন। এজন্যে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্বসম্প্রসারণবাদীদের শিখিয়ে দেয়া বুলি ও বুদ্ধি ত্যাগ করে।

ড. সৌমিত্র শেখর

অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..