কালের খেয়া মাল্যবান

Feature Image

জীবনানন্দ রচনা করেছেন প্রায় ১৬০০ কবিতা, এক ডজন উপন্যাস, প্রায় পঞ্চাশটি গল্প ও বহু প্রবন্ধ। তিরিশের দশক থেকে মৃত্যু অবধি তিনি যে গল্প-উপন্যাস রচনা করেছেন, তার একটিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। তাঁর কবিতার এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ গ্রন্থিত হয় তাঁর জীবদ্দশায়, যদিও আরও কয়েকশ’ কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তার অধিকাংশই বিভিন্ন লিট্‌?ল ম্যাগাজিনে। বাস্তবিকই, তাঁর অকালমৃত্যুর পরে কারও ধারণাই ছিল না যে, তাঁর পা ুলিপির ট্রাঙ্কের ভেতর বিপুল সংখ্যক অপ্রকাশিত গল্প-উপন্যাস রয়েছে।

জীবনানন্দ মনে করতেন, সমাজ ও অর্থনীতির সমস্যায় বহু মানুষের জীবন চিরকাল চক্করে ঘুরে চলেছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে উপন্যাস লিখেছেন তার কাঠামো সাধারণ উপন্যাস থেকে আলাদা- এই উপন্যাসের শুরুও নেই, শেষও নেই। তাঁর দু-একজন সাহিত্যিক বন্ধু দু-একটি উপন্যাস পড়ে বলেন, এই উপন্যাস লেখার ব্যাকরণ মানছে না। তাই এগুলো চলবে না। আর জীবনানন্দ নিজেও এগুলোকে ঘষা-মাজা করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি। তাঁর নিজের কিন্তু বিশ্বাস ছিল, মানুষের আসল সমস্যাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে এ রকম উপন্যাসের প্রয়োজন আছে। তাই ২০ বছরের বেশি সময়ে কয়েক ডজন খাতা ভর্তি করে এত গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তিনি এও জানতেন, ইউরোপের কিছু নামি লেখক এ ধরনের উপন্যাস লিখেছেন, যদিও জীবনানন্দের সব উপন্যাসই একান্তভাবে বাঙালির জীবন-সংকট নিয়ে।

‘মাল্যবান’ উপন্যাসে প্রকৃত অর্থেই জীবনানন্দ আধুনিক হতে পেরেছেন। ব্যক্তি মানুষের অসহায়ত্ব, জীবন নিয়ে খেলা, আপস করার কৌশল দেখে তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। তাঁর চেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে তাঁর রচিত ‘মাল্যবান’ চরিত্রটি। আড়াইশ’ টাকা মাইনে পাওয়া মাল্যবানের আর্থিক সামর্থ্য কম; কিন্তু মাল্যবান তার স্ত্রী ও সন্তানকে সুখে রাখতে চায়। কিন্তু আধুনিকা উৎপলা চায় জৌলুস। তাই মাল্যবান ছিটকে পড়ে। উৎপলা বাড়ির ওপরের ঘরে ভালো কক্ষে আরামে থাকে। সেখানে মাল্যবানের স্থান হয় না। মাল্যবানকে জীবন কাটাতে হয় বাড়ির নিচতলার কক্ষে ইঁদুরের সঙ্গে। উৎপলার কাছে আনন্দ করা, পার্টি করা, সিনেমা দেখা, পার্কে ঘুরে বেড়ানোই জীবনের নাম। দামি শাড়ি পরার মধ্যেই সে শান্তি পেতে চায়। মাল্যবান উৎপলার এ দাবি মেটাতে পারে না। এক সময় উৎপলা মাল্যবানের সামনেই গ্রহণ করে সমরেশকে। নিত্য অভাবে রোগাক্রান্ত কল্যাণী হেমের সঙ্গে সুখী নয়। তবু সে আপস করেছে ভাগ্যের সঙ্গে, জীবনকে বয়ে বেড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাল্যবান উপন্যাসে জীবনানন্দ যেন সে দায় এড়াতে চাইছেন। যেন কল্যাণীর যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করেই উৎপলা-সমরেশ আখ্যানের সূচনা। জীবনানন্দের উপন্যাসে সংঘাত আছে; আছে গভীর জীবনবোধ। এ সংঘাত সমাজের সঙ্গে নয়; ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নিজের অস্তিত্বের।

আরো খবর »